চৌদ্দগ্রাম (কুমিল্লা) প্রতিনিধি
সারাদেশজুড়ে রাজনৈতিক উত্তাপ ও বিভক্তির আবহে কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামে অনুষ্ঠিত এক ফুটবল টুর্নামেন্ট প্রমাণ করখেলাধুলা এখনও মানুষকে এক কাতারে দাঁড় করানোর শক্তি রাখে। রাজনীতি, মতাদর্শ ও ভিন্নতার সব দেয়াল ভেঙে স্মরণকালের সেরা জনসমাগমের মধ্য দিয়ে পর্দা নামল ‘শাহজালাল গাজী ডাবল হোন্ডা কাপ’ ফুটবল টুর্নামেন্ট–২০২৬ এর।
ভিতরচর উদীয়মান ক্রীড়া সংগঠনের সার্বিক ব্যবস্থাপনা ও আয়োজনে এবং কাতারপ্রবাসী সমাজসেবক, ‘গরীবের বন্ধু’ খ্যাত শাহজালাল গাজীর পূর্ণ পৃষ্ঠপোষকতায় শুক্রবার বিকালে অনুষ্ঠিত হয় ফাইনাল। ম্যাচে কুমিল্লার শীর্ষ ক্লাব মিয়াবাজার ফুটবল একাডেমিকেহারিয়ে শিরোপা নিজেদের নামে করে নেয় ডুমুরিয়া তরুণ জোট। বিকেল ৩টায় শুরু হওয়া ম্যাচটি নির্ধারিত সময়ে শেষ হয় ২–১ গোলের ব্যবধানে।
খেলা শেষে পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে বিজয়ী ডুমুরিয়া তরুণ জোটের হাতে চ্যাম্পিয়ন ট্রফি হিসেবে ১৮০ সিসির পালসার মোটরসাইকেল তুলে দেন প্রধান অতিথি কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজের ব্যবস্থাপনা বিভাগের বিভাগীয় প্রধান মো. জহিরুল ইসলাম পাটোয়ারী।
এ সময় তিনি বলেন, “খেলাধুলা শুধু বিনোদনের মাধ্যম নয়, এটি সমাজ গঠনের একটি শক্তিশালী হাতিয়ার। যুবসমাজকে সঠিক পথে রাখতে ক্রীড়ার বিকল্প নেই—এই টুর্নামেন্ট তারই প্রমাণ”।
রানার্সআপ মিয়াবাজার ফুটবল একাডেমি দলের হাতে বাজাজ ডিসকভার ১২৫ সিসির মোটরসাইকেল তুলে দেন ভাটরা কালজয়ী বিদ্যানিকেতনের প্রতিষ্ঠাতা ও সাবেক সভাপতি এম এ মতিন এবং কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজের সহযোগী অধ্যাপক ড. মো. আলমগীর হোসেন।
এম এ মতিন বলেন, “এ ধরনের আয়োজন শিক্ষিত সমাজ, রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও সাধারণ মানুষের মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরি করে, যা আজকের সময়ে অত্যন্ত প্রয়োজন”।
পুরো ম্যাচটির সার্বিক পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন ভাটরা সমাজ কল্যাণ সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি নুরুল আলম। আয়োজনে আরও সক্রিয় ভূমিকা রাখেন ভিতরচর উদীয়মান ক্রীড়া সংগঠনের জাহাঙ্গীর হোসেন, আমিনুল ইসলাম সোহেল, আব্দুস সালাম, ইউসুফ, কামাল ও আহাদ। পাশাপাশি ভিতরচর বন্ধন ক্লাবের সভাপতি হায়দার মজুমদার ও সহসভাপতি মঞ্জুরুল হাসান রিপনের সহযোগিতায় টুর্নামেন্টটি সফলভাবে সম্পন্ন হয়।
নকআউট পদ্ধতিতে আয়োজিত এই টুর্নামেন্টে শুরু থেকে ফাইনাল পর্যন্ত মোট আটটি ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয়। প্রতিটি ম্যাচেই ছিল শৃঙ্খলাপূর্ণ আয়োজন, প্রাণবন্ত পরিবেশ এবং দর্শকদের স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতি।
সবচেয়ে ব্যতিক্রমী দিক ছিল—আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে দেশের রাজনৈতিক উত্তেজনার মধ্যেও বিএনপি, জামায়াতসহ সব রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ। ভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শ থাকা সত্ত্বেও সবাই মাঠের গ্যালারিতে একসঙ্গে বসে খেলা উপভোগ করেন।
স্থানীয় এক প্রবীণ ক্রীড়া সংগঠক বলেন, “অনেক দিন পর এমন দৃশ্য দেখলাম, যেখানে রাজনীতি নয়—ফুটবলই ছিল সবার আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু”।
টুর্নামেন্টের শুরু থেকেই প্রতিটি ম্যাচে স্থানীয় বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের আমন্ত্রণ জানানো হয়, যা আয়োজকদের শিক্ষিত সমাজের প্রতি শ্রদ্ধা ও মূল্যবোধের প্রতিফলন বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
স্থানীয়দের মতে, চৌদ্দগ্রামে এই প্রথম এমন একটি ক্রীড়া আয়োজন অনুষ্ঠিত হলো যেখানে শিক্ষিত সমাজ, রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও সাধারণ মানুষ একসঙ্গে মিলিত হয়েছেন খেলাধুলার মঞ্চে। তারা আশা করছেন, নিয়মিত এ ধরনের আয়োজন যুবসমাজকে মাদক ও অপরাধ থেকে দূরে রাখতে কার্যকর ভূমিকা রাখবে।
মন্তব্য করুন