এইচএসসি পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর রাজউক উত্তরা মডেল কলেজে দেখা গেছে আনন্দ-উচ্ছ্বাসের পাশাপাশি হতাশার চিত্রও। কেউ পেয়েছেন প্রত্যাশিত ফল, কেউ আবার কাঙ্ক্ষিত ফল না পেয়ে মন খারাপ করেছেন। এর মধ্যেই নিজের ফল নিয়ে সন্তুষ্ট হলেও বন্ধুদের কয়েকজন প্রত্যাশিত ফল না পাওয়ায় উল্লাস করতে পারছেন না কলেজটির শিক্ষার্থী সামজিদ ইয়ালাম লাবিব।
শনিবার (৩১ অক্টোবর) ফল প্রকাশের পর রাজউক উত্তরা মডেল কলেজ প্রাঙ্গণে নিজের অনুভূতি জানাতে গিয়ে সামজিদ বলেন, ‘আলহামদুলিল্লাহ, ভালো লাগছে। এমন নয় যে প্রত্যাশার চেয়ে অনেক ভালো বা খারাপ ফল হয়েছে। যেমনটা আশা করেছিলাম, তেমনই পেয়েছি। আমি সন্তুষ্ট।’
পড়াশোনার পাশাপাশি খেলাধুলা, ঘোরাঘুরি ও বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটিয়েছেন জানিয়ে তিনি বলেন, গত দুই বছর মোটামুটি পড়াশোনা করেছেন। আবার একেবারে পড়াশোনা করেননি, এমনও নয়।
তবে নিজের ফল নিয়ে সন্তুষ্ট হলেও বন্ধুদের কয়েকজন প্রত্যাশিত ফল না পাওয়ায় আনন্দটা পূর্ণতা পাচ্ছে না তার। সামজিদ বলেন, ‘আমার অনেক বন্ধুর ফল প্রত্যাশা অনুযায়ী হয়নি। একজন বন্ধুর ফলও কিছুটা খারাপ হয়েছে। তাই সেভাবে উল্লাস করতে পারছি না। আমি একা ভালো ফল করে কী করব, আমার বন্ধুরাও ভালো করুক।’
এবারের পরীক্ষায় প্রশ্নপত্রের ভুল ও নির্ধারিত মানের বাইরে প্রশ্ন আসা নিয়েও অসন্তোষ প্রকাশ করেন সামজিদ। তার অভিযোগ, কিছু প্রশ্ন ছিল অত্যন্ত কঠিন এবং ভর্তি পরীক্ষার মানের প্রশ্নও ছিল। এতে পরীক্ষার হলে সময় নষ্ট হয়েছে।
নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বলেন, উচ্চতর গণিত প্রথম পত্রের পরীক্ষায় একটি ভুল প্রশ্ন নিয়ে দীর্ঘ সময় ব্যয় করতে হয়। পরে আরও দুটি অঙ্কের সমাধান করতে গিয়ে সময়ের অভাবে পুরো উত্তর দিতে পারেননি। শেষ পর্যন্ত অঙ্ক দুটির অর্ধেক করে উত্তর দিয়ে আসেন।
সামজিদ বলেন, বোর্ড পরীক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষায় প্রশ্নপত্রে এত ভুল থাকা এবং নির্ধারিত মানের বাইরে প্রশ্ন করা উচিত হয়নি। এতে শিক্ষার্থীরা বিভ্রান্ত হয়েছে। অনেকে পরীক্ষার মাঝেই হতাশ হয়ে পড়েছে, কেউ কেউ হাল ছেড়ে দিয়েছে। এসব সমস্যা না থাকলে হয়তো আরও ভালো ফল করতে পারত।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে সামজিদ জানান, বর্তমানে ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ভর্তির প্রস্তুতি নিচ্ছেন। ভালো কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে সুযোগ পেলে সেখানে পড়াশোনা করতে চান।
এদিকে সন্তানের ফলাফলে সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন সামজিদের মা মৌরিন আহসান জেবা। তিনি বলেন, ‘আমার ছেলে গোল্ডেন এ প্লাস না পেলেও সব বিষয়ে এ প্লাস পেয়েছে। আলহামদুলিল্লাহ, আমি অনেক খুশি। এই স্বপ্নটা আমার ছেলে নিজেই দেখেছে এবং নিজের চেষ্টায় পূরণ করেছে। ও অনেক পরিশ্রম করেছে।’
ছেলের পুরো পথচলা সহজ ছিল না জানিয়ে তিনি বলেন, সবসময় সন্তানের পাশে থাকতে পারেননি কিংবা সেভাবে সহযোগিতাও করতে পারেননি। পরীক্ষার সময় ছেলেকে মানসিক চাপের মধ্য দিয়েও যেতে হয়েছে। প্রশ্নপত্রও সবসময় আশানুরূপ ছিল না। তারপরও ভালো ফল করায় তিনি সন্তুষ্ট।
মৌরিন আহসান জেবা বলেন, ‘আমি ওকে বলেছি, ওর নিজের যে স্বপ্ন এবং যে বিষয়ে পড়ার ইচ্ছা, সে যেন সেই পথেই এগিয়ে যায়। ও নিজের পছন্দমতো ভবিষ্যৎ গড়ে তুলুক, এটাই আমার চাওয়া।’
রাজউক উত্তরা মডেল কলেজ থেকে এ বছর ১ হাজার ৬৩৬ জন শিক্ষার্থী এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে উত্তীর্ণ হয়েছেন ১ হাজার ৬২৬ জন। পাসের হার ৯৯ দশমিক ৩৯ শতাংশ। জিপিএ-৫ পেয়েছেন ৮২৯ জন। মোট পরীক্ষার্থীর ৫০ দশমিক ৬৭ শতাংশ জিপিএ-৫ পেয়েছেন।
বিভাগভিত্তিক ফলাফলে বিজ্ঞান বিভাগে ১ হাজার ১৩০ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে পাস করেছেন ১ হাজার ১২৪ জন। পাসের হার ৯৯ দশমিক ৪৭ শতাংশ। এ বিভাগে জিপিএ-৫ পেয়েছেন ৬৯৮ জন, যা মোট পরীক্ষার্থীর ৬১ দশমিক ৭৭ শতাংশ।
ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগে ৩৮৪ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে উত্তীর্ণ হয়েছেন ৩৮১ জন। পাসের হার ৯৯ দশমিক ২২ শতাংশ। জিপিএ-৫ পেয়েছেন ১০৪ জন, যা মোট পরীক্ষার্থীর ২৭ দশমিক ৮ শতাংশ।
অন্যদিকে মানবিক বিভাগে ১২২ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে পাস করেছেন ১২১ জন। পাসের হার ৯৯ দশমিক ১৮ শতাংশ। এ বিভাগে জিপিএ-৫ পেয়েছেন ২৭ জন, যা মোট পরীক্ষার্থীর ২২ দশমিক ১৩ শতাংশ।
সাফল্যের কৃতিত্ব শিক্ষার্থীদের দিয়ে কলেজের অধ্যক্ষ ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ আলী রেজা বলেন, ‘এই সাফল্যের মূল ভাগীদার ও কৃতিত্বের অধিকারী আমাদের শিক্ষার্থীরা। তাদের অক্লান্ত পরিশ্রমের ফলেই এ সফলতা অর্জন করা সম্ভব হয়েছে। আমরা শুধু আমাদের দায়িত্ববোধ থেকে কাজ করেছি এবং তাদের গাইডলাইন দিয়েছি। কষ্টের ফসলটা তাদের, কৃতিত্বও শুধু তাদের।’
তিনি বলেন, ‘আমাদের প্রতিষ্ঠানের মূলমন্ত্র হচ্ছে মানুষ হওয়ার জন্য শিক্ষা। এই সাফল্য তাদের মানুষ হওয়ার শিক্ষার পথে একটি ধাপ। আমি তাদের উত্তরোত্তর কল্যাণ কামনা করছি। ভবিষ্যতে তারা যেন আরও ভালো করতে পারে, সে জন্য সবার প্রতি শুভকামনা এবং আল্লাহর কাছে দোয়া করছি।’
কাঙ্ক্ষিত ফলাফল করতে না পারা শিক্ষার্থীদের হতাশ না হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন অধ্যক্ষ। তিনি বলেন, সবাই ভালো ফল করবে—এমন প্রত্যাশা থাকলেও সব সময় তা সম্ভব হয় না। তবে চেষ্টা অব্যাহত রাখলে একসময় সফলতা আসবে।
তিনি বলেন, ‘যারা কাঙ্ক্ষিত মান অর্জন করতে পারেনি, তাদের বলব, চেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে। জীবন এখানেই থেমে থাকে না। সামনে আরও অনেক পরীক্ষা রয়েছে। সেগুলোতে ভালো করার চেষ্টা করতে হবে। এবারের ফলাফল থেকে অনুপ্রেরণা নিয়ে সামনে এগিয়ে গেলে অবশ্যই ভালো করবে।’
মন্তব্য করুন