—– মতিন সৈকত
আমার নদ কালাডুমুর—সুরক্ষার দায়িত্ব আমার।
আর নয় দখল, দূষণ, ময়লা-আবর্জনার ভাগাড়।
এই মুহূর্তে দরকার-খাল-নদী সংস্কার।
কোনো নদী শুধু জলধারা নয়। নদী একটি জনপদের জীবন, কৃষকের স্বপ্ন, মানুষের স্মৃতি, প্রকৃতির প্রাণপ্রবাহ এবং সভ্যতার ধারক। নদীর সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক কখনো অর্থনৈতিক, কখনো পরিবেশগত, কখনো সাংস্কৃতিক। আবার কখনো তা হয়ে ওঠে একান্ত ব্যক্তিগত ভালোবাসা ও দায়িত্বের সম্পর্ক। আমার কাছে কালাডুমুর তেমনই একটি নদ। কালাডুমুর আমার শৈশব, কৈশোর ও যৌবনের স্মৃতিবাহী। কৃষিজীবনের অবলম্বন। কবিতার অনুপ্রেরণা। মানুষের জীবন-জীবিকার সহযাত্রী এবং দীর্ঘ চার দশকের আন্দোলন-সংগ্রামের কেন্দ্র।
কুমিল্লার দাউদকান্দি উপজেলার ইলিয়টগঞ্জ দক্ষিণ ইউনিয়নের আদমপুর গ্রামে আমার জন্ম। আদমপুর গ্রামটি কালাডুমুর নদের তীরে। জন্মসূত্রেই তাই কালাডুমুরের সঙ্গে আমার এক গভীর উত্তরাধিকারসূত্রের সম্পর্ক তৈরি হয়েছে। কালাডুমুর নদের পাড়েই আমাদের ৫/৬ বিঘা ফসলের জমি। কোনো এককালে সেই জমির ওপর একটি বাজার ছিল—নাম কাশীগঞ্জের বাজার। সে বাজার আমরা দেখিনি। তবে বাজারের অস্তিত্বের স্মারক হিসেবে জেলা পরিষদের খাস পুকুরটি রয়েছে। চাষাবাদ করতে গিয়ে জমির মাটির মধ্যে আমরা বাজারের চিহ্ন হিসেবে হাড়ি-পতিলের ভাঙা চাড়ার টুকরো পেয়েছি।
এই জমিগুলোতে স্থানীয় শিশু-কিশোরেরা অস্থায়ীভাবে খেলাধুলার ব্যবস্থা করত। খেলাধুলার টানে, আবার ফসলের মাঠে যাওয়ার তাগিদে নদীর পাড়ে সমবয়সীদের সঙ্গে আড্ডা, আলাপ ও খোশগল্প হতো। নদীর পাড়েই ছিল আমাদের সেচজীবনের বাস্তবতা। সমবায়ভিত্তিতে কেনা বোরোধানের মাঠে সেচের পানি সরবরাহের জন্য আমাদের দুটি সেচপাম্প ছিল। কৈশোরের মনে কবিতা লেখার আগ্রহও যেন জন্ম নিয়েছিল কালাডুমুরের টলমলে ঢেউয়ের আকর্ষণে।
এখনো কেউ বেড়াতে এলে আমি তাকে কালাডুমুর নদ দেখাতে নিয়ে যাই। কালাডুমুর নদের পাড়েই আমাদের সামাজিক কবরস্থান। আমার ভাগের জমিতেও কবরস্থানের একটি অংশ রয়েছে। সবকিছু মিলিয়ে শৈশব-কৈশোর থেকেই কালাডুমুরের সঙ্গে আমার প্রেম ও আত্মিক বন্ধন।
বর্ষায় কালাডুমুর ষোলোকলায় পূর্ণ হয়ে ওঠে। কিন্তু শুকনো মৌসুমে তার বুক শুকিয়ে যায়। সেচের পানির সংকটে বোরোধানের আবাদ বিঘ্নিত হয়। দীর্ঘ খরায় পানির অভাবে ধানের শীষ মুখে বের হতে পারে না। এলাকার একমাত্র বোরোধানের ফলনে বিপর্যয়ের আশঙ্কায় কৃষক দিশেহারা হয়ে পড়েন। তাদের সেই দুশ্চিন্তা আমাকেও তাড়িয়ে বেড়ায়।
আমাদের ১৮/২০ বিঘা জমিতে বোরোর আবাদ করতেন বাবা। কৃষক-পুত্র হিসেবে কালাডুমুর তাই আমার কাছে কোনো বাইরের বিষয় ছিল না। এটি আমার জীবনেরই একটি পাঠ্যপুস্তক—আমার সিলেবাসের অন্তর্ভুক্ত একটি নদ।
নদ না নদী?
নদ ও নদী নিয়ে বিশ্লেষকদের নানা মত রয়েছে। প্রচলিত একটি ধারণা হলো—যে জলস্রোতের নাম পুরুষবাচক, তাকে ‘নদ’ এবং যে নাম স্ত্রীবাচক, তাকে ‘নদী’ বলা হয়। আবার অনেকে মনে করেন, অ-কারান্ত নামগুলো ‘নদ’ এবং আ-কারান্ত, ই-কারান্ত বা ঈ-কারান্ত নামগুলো ‘নদী’। কিন্তু নদ ও নদীর পার্থক্য শাখা-প্রশাখা থাকা বা না থাকার সঙ্গে সম্পর্কিত নয়; এটি মূলত ব্যাকরণগত ব্যবহারের বিষয়।
সেই ব্যাকরণগত সূত্র ধরে আমি কালাডুমুর নদ বলি। নদী শব্দটি অবশ্য সাধারণ মানুষের কাছে অধিক পরিচিত ও বহুল ব্যবহৃত। প্রকৃত অর্থে যে জলস্রোত কোনো পর্বত, হ্রদ, প্রস্রবণ বা অন্য কোনো জলাধার থেকে উৎপন্ন হয়ে বিভিন্ন জনপদের ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে অন্য কোনো জলাশয় বা জলধারায় পতিত হয়, তাকে সাধারণভাবে নদ বা নদী বলা হয়।
বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ। ভাটির দেশ, পানির দেশ। হাওর, বাওর, জলাশয়, খাল, বিল, পুকুর, দিঘি, ডোবা ও প্লাবনভূমি এ দেশের প্রকৃতি ও জনজীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। আন্তর্জাতিক নদ-নদীর পানি প্রবাহ, উজানের পানি ব্যবস্থাপনা এবং ভাটির দেশের পানির ন্যায্য হিস্যা নিয়ে বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের উদ্বেগ রয়েছে। খরা মৌসুমে পানির সংকট এবং বর্ষায় অতিরিক্ত পানির প্রবাহ—দুই বিপরীত পরিস্থিতিই দেশের মানুষের জীবন ও কৃষির ওপর প্রভাব ফেলে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত। বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ব্যাপক ক্ষতির শিকার। পাশাপাশি ময়লা-আবর্জনা ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার কারণে অনেক নদ-নদী ও জলাধার দূষিত হচ্ছে। এই অত্যাচার থেকে ছোট নদ কালাডুমুরও রেহাই পাচ্ছে না।
কালাডুমুর রক্ষার দায়
কালাডুমুর নদ পুনঃখনন, পানির স্বাভাবিক গতিধারা সচল রাখা এবং ময়লা-আবর্জনা, বর্জ্য, দখল ও দূষণের বিরুদ্ধে আমার প্রায় ত্রিশ বছরের লড়াই-সংগ্রাম অব্যাহত আছে।
কালাডুমুরকে আমি সবসময় “আমার নদ” বলে পরিচয় দিই। এটি কোনো ব্যক্তিগত মালিকানার দাবি নয়; বরং দায়িত্ববোধের প্রকাশ। এক ধরনের তত্ত্বাবধায়ক-মানসিকতা। আমরা বললে অনেক সময় কেউ গা লাগাতে চায় না। কিন্তু আমি বললে দায়িত্বটি নিজের ওপর চলে আসে। কোনো একটি কাজ নিয়ে বছরের পর বছর, যুগের পর যুগ লেগে থাকলে সেই কাজকে একদিন গন্তব্যের দিকে নিয়ে যাওয়া সম্ভব—এই বিশ্বাস থেকেই কালাডুমুরকে নিয়ে আমার পথচলা।
কালাডুমুর নদ এবং আমাকে নিয়ে অনেকে গল্প, কবিতা, প্রবন্ধ ও প্রতিবেদন লিখে আমাকে কৃতার্থ করেছেন। কালাডুমুর সম্পর্কে আমার লেখা দুটি কবিতাতেও নদের সঙ্গে আমার গভীর বন্ধনের অনুভূতি প্রকাশ পেয়েছে।
কালাডুমুর কাব্য
আমার শৈশব কৈশোর যৌবনের পালতোলা সঙ্গীত
যোগায় জীবনী শক্তি মাছে ভাতে বাঙালির ইঙ্গিত।
ক্ষুধায় যদি না পাই অন্ন হয়ে যাই অমানুষ বন্য
কালাডুমুর ভরদুপুর বাজায় ঘুমের নুপুর
ফলায়ে ফসল সমৃদ্ধ জীর্ণ-শীর্ণ বয়োবৃদ্ধ
তৃষ্ণায় ক্ষুধায় ক্লান্ত নিরিবিলি চুপসে শান্ত।
নিজেরা করি পরিমাপ পূনঃখনন
পানির জন্য মন কাদে করে দহন।
মুমূর্ষু শয্যশায়ীর উৎকণ্ঠা
বাঁচবেতো কালাডুমুরেের প্রাণটা।
কালাডুমুর পূনঃখননে অস্থির
খরায় পেলে পানি কৃষক স্বস্তির।
খাল বিল নদ নদী বহে যেন নিরবধি
যাক দুঃসহ শীত এসো সোনালী অতীত।
কালাডুমুর
আমার একটি নদ আছে কালাডুমুর
কৈশোর যৌবনে ভালোবাসায় ভরপুর।
বর্ষায় ভরা যৌবন শুকনোয় মরা খাল
নদী দেখে বোঝা যায় দেশের হালচাল।
সেচের পানির অভাবে বোরোধানের সর্বনাশ
কি খেয়ে বাঁচবে জনগণ উৎকণ্ঠায় বারমাস।
শরীরের শিরা উপশিরায় চলে রক্ত সঞ্চালন
তেমনি দেশের প্রাণ নদ-নদীর চাই পূনঃখনন।
নিজে করি নদীর জরিপ পরিমাপ পুনঃ খনন
সংবাদ সন্মেলন কোদাল মিছিল মানববন্ধন।
নদী মেলা নদী অলিম্পিয়াডসহ বহু আয়োজন
সংবাদপত্রে আর টিভিতে হয় নিউজ ঘন ঘন।
এই দেখে এমপি মহোদয় করেন আবেদন
যাচাই-বাছাই শেষে শুরু হয় নদী পূনঃখনন।
ত্রিশ বছরের আন্দোলনে জাগাই জনগণ
সঙ্গী হয় সাংবাদিক জনগণ ও প্রশাসন।
আশেপাশের খাল নদী খননে দেই নেতৃত্ব
সবার সাথে গড়ে তুলি সুসম্পর্ক ভাতৃত্ব।
নব্বইয়ের দশকের পুনঃখনন এবং কৃষকের অসন্তোষ
নব্বইয়ের দশকের শুরুতে একবার কালাডুমুর পুনঃখনন শুরু হয় সরকারি বাজেটে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের উদ্যোগে। কিন্তু সেই খননে কৃষক সন্তুষ্ট হতে পারেননি। নদ সঠিকভাবে পুনঃখনন না হওয়ায় অনিয়মের বিরুদ্ধে আমরা বিরাট কৃষক সম্মেলনের আয়োজন করি এবং সুষ্ঠুভাবে পুনঃখননের দাবি জানাই।
সেই সম্মেলন ও দাবি-আন্দোলন থেকেই কালাডুমুর পুনঃখননের প্রচেষ্টা নতুন গতি পায়। এটি ছিল দীর্ঘ এক কাহিনির সূচনা।
২০০৭-এর খরা এবং কৃষকের নিজস্ব উদ্যোগ
২০০৭ সালে টানা ৫/৬ মাস বৃষ্টি হয়নি। প্রচণ্ড খরায় কালাডুমুরসহ খাল-বিল ও জলাশয় শুকিয়ে যায়। ফসলের মাঠ ফেটে চৌচির হয়ে পড়ে।
আমি তখন সেচ প্রকল্পের ব্যবস্থাপক। মাত্র ২০০ টাকায় পুরো মৌসুম—ধান রোপণ থেকে পাকা ধান কাটা পর্যন্ত—সেচের পানি সরবরাহ করতাম। কিন্তু কালাডুমুর তখন পানি-শূন্য।
নদীর পানি ব্যবহার করে যারা সেচ দিতাম, তাদের কয়েকজন একসঙ্গে হয়ে মিটিং করে সিদ্ধান্ত নিই—পানি সঞ্চালনের জন্য নদের ভেতরে ড্রেনেজ করে দিলে পানি আসতে পারে। অমাবস্যা-পূর্ণিমায় জোয়ার এলে পানি আসার সম্ভাবনাও ছিল।
সেচ প্রকল্পের ব্যবস্থাপক গৌরীপুরের আব্দুল লতিফ প্রধানের নেতৃত্বে আমরা নিজেদের অর্থে কালাডুমুরের উৎসমুখের কিছু অংশ পুনঃখনন করি। আল্লাহর অশেষ রহমতে সেচ দেওয়ার জন্য আমরা আংশিক পানি পাই।
সেই সময়ে বৃষ্টির জন্য মাইকিং করে পরপর তিন দিন আদমপুর-পুটিয়া ফসলের জমিতে ইস্তিসকার নামাজ আদায় করি। আল্লাহর কাছে মোনাজাত করি, কান্নাকাটি করি। আল্লাহর খাস রহমতে চতুর্থ দিন মৌসুমি বৃষ্টি শুরু হয়। আমাদের আনন্দের সীমা ছিল না। সে সময় বৃষ্টির জন্য নামাজের সংবাদ কয়েকটি পত্রিকায়ও প্রকাশিত হয়।
নদীর দৈর্ঘ্য পরিমাপের এক অনন্য অভিজ্ঞতা
কালাডুমুর পুনঃখননের জন্য পানি উন্নয়ন বোর্ডে দরখাস্ত জমা দিই। কয়েক মাস পরে ডাক আসে। দেখা করতে গেলে একজন কর্মকর্তা বলেন—পারলে নদীর দৈর্ঘ্য ও প্রস্থ মেপে নিয়ে আসতে।
এই কথায় আমি আশার আলো দেখতে পেলাম।
বর্ষাকাল। নদী তখন থৈথৈ পানি। ১২/১৪ হাত লগি পানিতে ডুবে যায়। দুইটি নৌকায় ছয়জন লোক নিয়ে আমরা গৌরীপুর থেকে কালাডুমুর নদের প্রায় ১১ কিলোমিটার পরিমাপ করি। পরে সেই পরিমাপের তথ্য জমা দিই।
নদী পুনঃখননের দাবিতে একের পর এক মানববন্ধন, সংবাদ সম্মেলন, কোদাল মিছিল, নদী মেলা, নদী অলিম্পিয়াডসহ বহুমুখী আয়োজন করি। নদীপাড়ের মানুষকে জাগিয়ে তুলি।
নদী কমিশনের চেয়ারম্যান, বিএডিসির চেয়ারম্যান, সচিব, মাননীয় জাতীয় সংসদ সদস্য এবং মাননীয় কৃষিমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে কালাডুমুর নদ খননের দাবি জানাই। ২০১০ সালে জাতীয় কৃষি পদক গ্রহণের সময় মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছেও কালাডুমুর নদ পুনঃখননের আবেদন করি।
গণমাধ্যম, প্রশাসন ও পুনঃখননের উদ্যোগ
এই দীর্ঘ আন্দোলনে সাংবাদিক বন্ধুরা নিঃস্বার্থভাবে আমাদের কাজের সঙ্গী হয়েছেন। তাদের হাত ধরেই কালাডুমুরের দাবি গণমাধ্যমে উঠে এসেছে। মিডিয়া, প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের সহযোগিতায় অবশেষে ২০২০ সালের ১০ ডিসেম্বর কালাডুমুর নদ পুনঃখননের কাজের উদ্বোধন হয়।
কিন্তু কিছু অংশ খনন করার পর অদৃশ্য কারণে কাজ বন্ধ হয়ে যায়। যে অংশটুকু খনন হয়েছে, সেটুকুও পানিসঞ্চালনে সহায়ক হয়েছে। কিন্তু নদ-নদী পূর্ণভাবে খনন না হলে সমস্যার স্থায়ী সমাধান হয় না।
তাই কালাডুমুরসহ দেশের প্রয়োজনীয় নদীগুলো পুনঃখনন করা আবশ্যক।
দখল, দূষণ ও বর্জ্যের ভাগাড়
গত দুই দশক ধরে ময়লা-আবর্জনা ও বর্জ্যের ভাগাড় বানিয়ে কালাডুমুরকে হত্যার এক ধরনের প্রক্রিয়া চলছে। একটি নদীকে হত্যা করা মানে শুধু একটি জলধারাকে ধ্বংস করা নয়; এর সঙ্গে ধ্বংস হয় কৃষির সম্ভাবনা, জলজ জীববৈচিত্র্য, পরিবেশের ভারসাম্য এবং মানুষের জীবন-জীবিকা।
কালাডুমুরকে বাঁচাতে তাই শুধু পুনঃখনন নয়—দখলমুক্তকরণ, দূষণ বন্ধ, ময়লা-আবর্জনা অপসারণ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং পানির স্বাভাবিক প্রবাহ নিশ্চিত করা জরুরি।
কালাডুমুরকে বাঁচানোর জন্য হাজারো মতিন সৈকত দরকার।
কালাডুমুর ও আমার পারিবারিক-সামাজিক জীবন
কালাডুমুরের সঙ্গে আমার সম্পর্ক শুধু আন্দোলন কিংবা কৃষির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। আমার জীবনের নানা স্তরের সঙ্গে নদটি জড়িয়ে আছে।
আমাদের পারিবারিক কৃষিজমি নদীর পাড়ে। এককালের কাশীগঞ্জের বাজারের স্মৃতি সেই জমিতে আজও মাটির নিচে লুকিয়ে আছে। শৈশবের খেলাধুলা, কৈশোরের আড্ডা, কৃষিকাজ, সেচ, নদীর ঢেউ, কবিতার জন্ম—সবকিছুর সাক্ষী কালাডুমুর।
আমাদের সামাজিক কবরস্থানও কালাডুমুরের পাড়ে। আমার ভাগের জমির একটি অংশও সেই কবরস্থানের অন্তর্ভুক্ত। ফলে জীবনের আনন্দ-বেদনা, জন্ম-শৈশব-কৈশোর-যৌবন এবং শেষ আশ্রয়ের স্মৃতির সঙ্গেও কালাডুমুর যুক্ত।
কেউ বেড়াতে এলে আজও তাকে কালাডুমুর দেখাতে নিয়ে যাই। কারণ আমার কাছে এটি কোনো সাধারণ নদ নয়। এটি আমার অস্তিত্বের একটি অংশ।
কালাডুমুর ও কৃষি
কালাডুমুরের পানি কৃষির সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। বর্ষায় নদ ভরে ওঠে। শুষ্ক মৌসুমে পানি কমে যায় বা শুকিয়ে যায়। বোরোধানের সেচের জন্য তখন কৃষককে নানা সংকটে পড়তে হয়।
দীর্ঘ খরায় যখন ধানের শীষ মুখে বের হতে পারে না, তখন শুধু একটি পরিবারের নয়—পুরো এলাকার কৃষি অর্থনীতি বিপর্যয়ের আশঙ্কায় পড়ে। কৃষকের সেই উৎকণ্ঠা আমাকে তাড়িয়ে বেড়ায়।
কৃষক-পুত্র হিসেবে আমি জানি, একটি নদীর পানি কতটা গুরুত্বপূর্ণ। তাই কালাডুমুরের পানি মানে আমার কাছে কৃষকের স্বস্তি, ধানের শীষ, খাদ্যের নিরাপত্তা এবং মানুষের জীবনধারণের সম্ভাবনা।
সরকারি ভূমি-রেকর্ডে কালাডুমুর
নদী-সংক্রান্ত রেকর্ডের বিএস তথ্য অনুযায়ী কালাডুমুর নদীর উৎসমুখ গোমতী নদী এবং পতন বায়েক খাল। গৌরীপুর বাজারসংলগ্ন এলাকা থেকে ইলিয়টগঞ্জ বাজার পর্যন্ত কালাডুমুরের দৈর্ঘ্য ১১ কিলোমিটার।
দাউদকান্দি উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) স্বাক্ষরিত ছাপানো খতিয়ানে দাউদকান্দির নদীর তালিকায় কালাডুমুর নদ-সম্পর্কিত যে তথ্য-উপাত্ত রয়েছে, তা হলো—
মৌজা
দাগ নম্বর
পরিমাণ
চর চাইরপাড়া
১৩৯৭, ১৩৭০
০.৯৪
গৈলারচর
৪৪৩
১.৮৫
ওলানপাড়া
২৯৬
১১.৪১
চর রায়পুর
৫০৫, ৫০৬
৪.০২
চান্দের চর
১,২৭৪
৩.০৫
ছান্দ্রা
০১
২.৮৯
বাহাদুরখোলা
০১
২.৬৬
বানিয়াপাড়া
৩৮, ৩৯, ৮১, ১৩৩, ১৪১, ১৪৭
১.৯২
কুশিয়ারা
১৯২৪
৩.৮৭
পুটিয়া বাসরা
০১
১.৫১
টামটা
৬৪, ৬৫, ৯৫৩, ১০৯৪, ১০৯০, ৬৯৬, ১০৯৩
৮.০০
বীরতলা
৩৩৮, ৮০০
২.৯২
ইলিয়টগঞ্জ
১২৪
১.৪১
গৌরীপুর বাজারসংলগ্ন চর চাইরপাড়া মৌজা থেকে শুরু করে গৈলারচর, ওলানপাড়া, চর রায়পুর, চান্দের চর, ছান্দ্রা, বাহাদুরখোলা, বানিয়াপাড়া, কুশিয়ারা, পুটিয়া বাসরা, টামটা, বীরতলা হয়ে ইলিয়টগঞ্জ পর্যন্ত কালাডুমুরের ভূমি-রেকর্ডভিত্তিক উপস্থিতি এই নদের অস্তিত্ব ও বিস্তৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল।
নদ বাঁচানোর আন্দোলন মানে জনপদ বাঁচানোর আন্দোলন
কালাডুমুরের ইতিহাস আসলে একটি নদকে বাঁচানোর ইতিহাসের পাশাপাশি একটি জনপদকে বাঁচানোর ইতিহাস। এই নদকে ঘিরে কৃষকের সেচ, বোরোধানের আবাদ, মানুষের চলাচল, জলজ জীববৈচিত্র্য, শৈশবের স্মৃতি এবং সামাজিক সম্পর্ক গড়ে উঠেছে।
একটি নদীর প্রাণপ্রবাহ বন্ধ হয়ে গেলে তার সঙ্গে সম্পর্কিত অসংখ্য জীবনও ধীরে ধীরে সংকটে পড়ে। তাই নদী রক্ষা কেবল পরিবেশবাদীদের কাজ নয়। এটি কৃষকের কাজ, শিক্ষকের কাজ, সাংবাদিকের কাজ, প্রশাসনের কাজ, জনপ্রতিনিধির কাজ এবং সর্বোপরি নদীপাড়ের মানুষের দায়িত্ব।
আমার দীর্ঘ আন্দোলনের অভিজ্ঞতা বলে—দাবি যদি ন্যায্য হয়, মানুষকে যদি সঙ্গে নেওয়া যায় এবং কাজের প্রতি দীর্ঘমেয়াদি নিষ্ঠা থাকে, তাহলে অসম্ভব বলে কিছু থাকে না।
কালাডুমুর আমার কাছে শুধু একটি নদ নয়—এটি আমার জীবনের একটি দীর্ঘ অধ্যায়। শৈশবের খেলাধুলা, কৈশোরের আড্ডা, যৌবনের কবিতা, কৃষকের সেচ, বাবার বোরোধানের ক্ষেত, পারিবারিক জমি, সামাজিক কবরস্থান—সবকিছুর সঙ্গে এই নদ জড়িয়ে আছে। তাই কালাডুমুরের পানি শুকিয়ে গেলে শুধু একটি নদ শুকিয়ে যায় না; আমার শৈশবের একটি অংশ, আমার জনপদের একটি অংশ এবং কৃষকের স্বপ্নের একটি অংশও যেন শুকিয়ে যায়।
বর্ষায় কালাডুমুরের যৌবন আমাকে আনন্দ দেয়; শুষ্ক মৌসুমে তার পানিশূন্যতা আমাকে ব্যথিত করে। কৃষকের জমিতে যখন পানির অভাবে ধানের শীষ বের হতে পারে না, তখন সেই কষ্ট আমার নিজের কষ্ট বলে মনে হয়। কারণ কৃষক-পুত্র হিসেবে আমি জানি—পানি ছাড়া কৃষি বাঁচে না, কৃষি ছাড়া মানুষ বাঁচে না।
গত প্রায় ত্রিশ বছর ধরে কালাডুমুরের পুনঃখননের দাবিতে আমি কখনো কৃষকদের সঙ্গে, কখনো সাংবাদিকদের সঙ্গে, কখনো প্রশাসনের কাছে, কখনো জনপ্রতিনিধিদের কাছে, কখনো মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কাছে ছুটেছি। মানববন্ধন করেছি, সংবাদ সম্মেলন করেছি, কোদাল মিছিল করেছি, নদী মেলা করেছি, নদী অলিম্পিয়াড করেছি। নিজেরা নদী পরিমাপ করেছি। দুই নৌকায় ছয়জন মানুষ নিয়ে প্রায় ১১ কিলোমিটার নদপথ পরিমাপ করে কর্তৃপক্ষের কাছে জমা দিয়েছি। এমনকি খরার সময়ে নিজেদের অর্থে নদীর উৎসের অংশবিশেষ পুনঃখনন করেছি।
২০১০ সালে জাতীয় কৃষি পদক গ্রহণের সময়ও কালাডুমুরের পুনঃখননের দাবি জানিয়েছি। শেষ পর্যন্ত ২০২০ সালের ১০ ডিসেম্বর পুনঃখননের কাজ উদ্বোধন হয়েছিল। কিন্তু কাজ অসম্পূর্ণ রয়ে গেছে। কিছু অংশ খনন হলেও পূর্ণাঙ্গ পুনঃখনন না হওয়ায় কালাডুমুরের সংকটের স্থায়ী সমাধান হয়নি।
তাই এখন প্রয়োজন নতুন করে উদ্যোগ। প্রয়োজন উৎস থেকে পতন পর্যন্ত পূর্ণাঙ্গ পুনঃখনন। প্রয়োজন নদীর সীমানা রক্ষা ও দখলমুক্তকরণ। প্রয়োজন ময়লা-আবর্জনা ও বর্জ্য ফেলা বন্ধ করা। প্রয়োজন সংযোগকারী খাল-বিল ও জলাধার পুনরুদ্ধার। প্রয়োজন শুষ্ক মৌসুমে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ নিশ্চিত করা। প্রয়োজন কৃষি, পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য ও জনজীবনকে সমন্বিত করে দীর্ঘমেয়াদি নদী ব্যবস্থাপনা।
কালাডুমুরের প্রতি আমার যে ভালোবাসা, সেটি ব্যক্তিগত হলেও নদ রক্ষার দাবি ব্যক্তিগত নয়। এই দাবি কৃষকের, এই দাবি জনপদের, এই দাবি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের।
আমি যখন বলি “আমার নদ কালাডুমুর”, তখন আমি কোনো মালিকানার কথা বলি না। আমি দায়িত্বের কথা বলি। আমি তত্ত্বাবধানের কথা বলি। আমি ভালোবাসার কথা বলি। আমি বলতে চাই—যে নদকে আমরা ‘আমার’ বলে ভালোবাসতে পারি, সেই নদকে আমরা দখল হতে দেব না, দূষিত হতে দেব না, ময়লা-আবর্জনার ভাগাড় হতে দেব না।
কালাডুমুরকে বাঁচাতে একজন মতিন সৈকত যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন হাজারো সচেতন মানুষ। প্রয়োজন কৃষক, শিক্ষক, শিক্ষার্থী, সাংবাদিক, প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি, পরিবেশকর্মী ও নদীপাড়ের সাধারণ মানুষের সম্মিলিত উদ্যোগ।
আমার বিশ্বাস—একদিন কালাডুমুর আবার তার হারানো যৌবন ফিরে পাবে। বর্ষার পানিতে শুধু নদ ভরবে না; মানুষের আশাও ভরবে। সেচের পানি পেয়ে কৃষকের মুখে হাসি ফুটবে। মাছ ও জলজ প্রাণ ফিরে আসবে। নদীর সঙ্গে ফিরে আসবে জনপদের প্রাণপ্রবাহ।
কালাডুমুর বাঁচুক।
কালাডুমুর নদের সঙ্গে খাল-বিল ও প্লাবনভূমির সম্পর্ক
কালাডুমুর নদ শুধু একটি স্বতন্ত্র জলপ্রবাহ নয়। এর সঙ্গে আশপাশের খাল, বিল, জলাশয় ও প্লাবনভূমির রয়েছে নিবিড় ও পারস্পরিক সম্পর্ক। বর্ষাকালে নদীর পানি বৃদ্ধি পেলে আশপাশের নিম্নভূমি, বিল ও খালগুলোতে পানি প্রবেশ করে এবং একটি বিস্তৃত জলাভূমি-নির্ভর জলপ্রবাহব্যবস্থা গড়ে ওঠে। আবার শুষ্ক মৌসুমে এসব খাল-বিলের পানি ধীরে ধীরে নদীর সঙ্গে সংযোগ রক্ষা করে স্থানীয় কৃষি, মৎস্য ও জীববৈচিত্র্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
নদ খতিয়ানে কালাডুমুরের দৈর্ঘ্য প্রায় ১১ কিলোমিটার হিসেবে উল্লেখ থাকলেও মাঠপর্যায়ের জলপ্রবাহের বাস্তবতায় এর প্রভাব ও বিস্তৃতি কেবল ওই ১১ কিলোমিটারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বিশেষ করে ইলিয়টগঞ্জ বাজারের দক্ষিণ পাশে প্রবাহিত বায়েক খাল এবং পরবর্তী পর্যায়ে খিরাই নদের সঙ্গে সংযোগ কালাডুমুরের জলপ্রবাহকে বৃহত্তর একটি আন্তঃসংযুক্ত নদী-খাল ব্যবস্থার অংশে পরিণত করেছে। ফলে কালাডুমুরকে শুধু খতিয়ানে নির্ধারিত একটি সরল নদরেখা দিয়ে বিচার করলে এর প্রকৃত জলজ ও পরিবেশগত ভূমিকার পূর্ণ চিত্র পাওয়া যায় না।
কালাডুমুরের সঙ্গে সংযুক্ত খাল-বিল ও নিম্নাঞ্চল বর্ষা মৌসুমে অতিরিক্ত পানি ধারণ ও প্রবাহিত করার ক্ষেত্রে প্রাকৃতিক জলাধার ও নিষ্কাশনপথ হিসেবে কাজ করে। একই সঙ্গে এসব প্লাবনভূমি বর্ষাকালে দেশীয় মাছের প্রজনন, বিচরণ ও খাদ্য সংগ্রহের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হয়ে ওঠে। নদীর সঙ্গে বিল ও খালের সংযোগ অক্ষুণ্ণ থাকলে মাছ নদী থেকে প্লাবনভূমিতে এবং আবার সেখান থেকে নদীতে চলাচলের সুযোগ পায়। এ কারণে কালাডুমুরের সঙ্গে সংযুক্ত জলাভূমিগুলো স্থানীয় মৎস্যসম্পদের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।
প্লাবনভূমিতে মৌসুমি মৎস্যচাষ ও প্রাকৃতিক মাছ আহরণের ক্ষেত্রেও কালাডুমুরের ভূমিকা রয়েছে। বর্ষার পানিতে প্লাবিত নিম্নাঞ্চল অনেক সময় মাছের জন্য উপযোগী আবাসস্থলে পরিণত হয়। স্থানীয় জনগোষ্ঠী এসব জলাশয় ও প্লাবনভূমিকে পরিকল্পিতভাবে ব্যবহার করতে পারলে মাছ উৎপাদন, কৃষি ও জীবিকার সুযোগ বাড়তে পারে। একই সঙ্গে নদী, খাল, বিল ও প্লাবনভূমির স্বাভাবিক সংযোগ বজায় থাকলে জলাবদ্ধতা কমানো, পানি নিষ্কাশন এবং কৃষিজমিতে সেচের পানির প্রাপ্যতা বৃদ্ধিতেও ইতিবাচক ভূমিকা রাখা সম্ভব।
কালাডুমুরকে রক্ষা করার উদ্যোগ শুধু নদটির মূল প্রবাহ খনন বা দখলমুক্ত করার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা যথেষ্ট নয়। এর সঙ্গে যুক্ত বায়েক খাল, খিরাই নদ, বিল, জলাশয় ও প্লাবনভূমিকে একটি সমন্বিত জলপ্রবাহব্যবস্থার অংশ হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন। নদীর সঙ্গে খাল-বিলের সংযোগ পুনরুদ্ধার, দখল ও দূষণমুক্তকরণ, প্রয়োজনীয় স্থানে পুনঃখনন এবং প্লাবনভূমির স্বাভাবিক পানি চলাচল নিশ্চিত করা গেলে কালাডুমুর আবারও কৃষি, মৎস্য, জীববৈচিত্র্য ও জনজীবনের জন্য একটি কার্যকর প্রাকৃতিক সম্পদ হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
কালাডুমুরের স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ ফিরে আসুক।
দখল ও দূষণমুক্ত হোক তার বুক।
বাঁচুক কৃষক, বাঁচুক প্রকৃতি, বাঁচুক জীববৈচিত্র্য।
বাঁচুক কালাডুমুর—বাঁচুক আমাদের জনপদ।
আমার নদ কালাডুমুর—সুরক্ষার দায়িত্ব আমার, আপনার, আমাদের সবার।
(লেখক, চারবার জাতীয় পদক প্রাপ্ত কৃষি পরিবেশ সমাজ উন্নয়ন সংগঠক। এগ্রিকালচারাল ইম্পর্ট্যান্ট পারসন এআইপি। গ্রন্থকার, পানি সম্পর্কিত কুরআনের আয়াত ও পরিবেশ প্রকৃতি, কুরআন-হাদিসের আলোকে খাদ্য অর্থনীতি ও জলবায়ু, কুমিল্লার নদ-নদী)