এক হাতে লাঠি, অন্য হাতে গাছের ডালপালা দিয়ে তৈরি ঝাড়ু। শরীরজুড়ে বার্ধক্যের ছাপ, চলতে গেলেই লাঠির ওপর ভর দিতে হয়। তবুও ৮৫ বছরেও থেমে নেই তাঁর পথচলা। প্রতিদিন ফজরের নামাজ শেষে প্রায় এক কিলোমিটার পথ হেঁটে ছুটে আসেন বিরামপুরের পূর্ব জগন্নাথপুর এলাকার ঈদগাহ মাঠ সংলগ্ন কবরস্থানে। এখানে শুয়ে আছেন তাঁর প্রিয়তমা স্ত্রী জাহানারা বক্স (ঝর্ণা)। শুয়ে আছেন অসংখ্য পরিচিতজন, বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়স্বজন ও এলাকার বহু মানুষ। তাঁদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা, তাঁদের জন্য দোয়া আর কবরস্থানের প্রতি গভীর মমত্ববোধ থেকেই প্রতিদিনের এই ছুটে আসা।
তিনি আর কেউ নন, অ্যাডভোকেট মোঃ মওলা বক্স। প্রিয় স্ত্রীকে হারানোর পর এক যুগেরও বেশি সময় ধরে নীরবে কবরস্থানের পরিচ্ছন্নতা রক্ষায় কাজ করে যাচ্ছেন তিনি। নেই কোনো প্রচার-প্রচারণা, নেই কোনো প্রতিদানের প্রত্যাশা। আছে শুধু ভালোবাসা, বিশ্বাস আর পরকালের প্রতি গভীর উপলব্ধি।
জাহানারা বক্স (ঝর্ণা) ছিলেন একজন শিক্ষিকা। জন্ম ১৭ অক্টোবর ১৯৫৪ সালে। তাঁর মৃত্যু হয় ২১ ডিসেম্বর ২০১১ সালে। বিরামপুরের ঢাকা মোড় এলাকার বাসিন্দা কবরস্থানে চিরনিদ্রায় শায়িত আছেন তিনি।
স্ত্রীর মৃত্যুর পর সময় গড়িয়েছে, বদলেছে জীবনের অনেক হিসাব। কিন্তু বদলায়নি মওলা বক্সের অভ্যাস। প্রতিদিন ফজরের নামাজ শেষে স্ত্রীর কবরের কাছে ছুটে আসেন তিনি। কবরের পাশে কিছুক্ষণ বসে থাকেন, স্ত্রীর স্মৃতিচারণ করেন, তাঁর আত্মার মাগফিরাত কামনা করে দোয়া করেন। একই সঙ্গে কবরস্থানে শায়িত অন্য পরিচিতজনদের জন্যও দোয়া করেন।
কবরস্থানে না এলে যেন তাঁর মনই ভালো থাকে না। প্রিয় মানুষটির কাছে আসা, তাঁর জন্য দোয়া করা এবং চারপাশটা পরিষ্কার রাখা—এসবের মধ্যেই খুঁজে পান একধরনের মানসিক প্রশান্তি।
কথা বলতে গিয়ে স্ত্রীর জীবনের নানা স্মৃতি তুলে ধরেন তিনি। কখনো স্মৃতির কথা বলতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। তাঁর কথায় স্পষ্ট হয়ে ওঠে, মানুষটি পৃথিবী থেকে বিদায় নিলেও হৃদয়ের গভীর থেকে হারিয়ে যাননি।
বয়সের ভারে শরীর এখন আর আগের মতো সঙ্গ দেয় না। হাঁটাচলায় কষ্ট হয়। তবুও প্রতিদিন কবরস্থানে এসে বসে থাকেন না শুধু; নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী পরিচ্ছন্নতার কাজও করেন।
এক হাতে লাঠিতে ভর দিয়ে অন্য হাতে গাছের ডালপালা দিয়ে তৈরি ঝাড়ু ধরে কবরস্থানের রাস্তা পরিষ্কার করেন। ঝরে পড়া পাতা, শুকনো ডালপালা ও অন্যান্য ময়লা সরিয়ে চলাচলের পথ পরিচ্ছন্ন রাখার চেষ্টা করেন।
কাজটি তাঁর কাছে শুধু পরিচ্ছন্নতার দায়িত্ব নয়; এটি যেন জীবনের শেষ প্রান্তে এসে ভালোবাসা প্রকাশের এক অনন্য ভাষা। যাঁরা একসময় তাঁর জীবনের অংশ ছিলেন, যাঁদের সঙ্গে ছিল আত্মীয়তা, বন্ধুত্ব কিংবা সামাজিক সম্পর্ক—তাঁদের শেষ আশ্রয়স্থলটুকু পরিষ্কার রাখার মধ্যেই তিনি খুঁজে পান নিজের দায়িত্ববোধের প্রতিফলন।
শারীরিক সীমাবদ্ধতা তাঁকে থামিয়ে দিতে পারেনি। যতটুকু পারেন, ততটুকুই করেন। কারণ তাঁর বিশ্বাস, মৃত্যুর পর এই কবরস্থানই মানুষের শেষ ঠিকানা।
কেন প্রতিদিন এত কষ্ট করে কবরস্থানে আসেন? কেনই-বা বয়সের ভার উপেক্ষা করে নিজ হাতে পরিষ্কার করেন এখানকার পথঘাট?
এমন প্রশ্নের উত্তরে অ্যাডভোকেট মওলা বক্সের বক্তব্যে উঠে আসে জীবনের গভীর এক উপলব্ধি।
তিনি বলেন, “আমার স্ত্রী এখানে শুয়ে আছেন। এখানে আমার অনেক বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়স্বজন ও পরিচিত মানুষও শায়িত আছেন। একদিন আমাকেও এখানে আসতে হবে। এটাই আমাদের শেষ ঠিকানা। আমি তাঁদের জন্য দোয়া করি, কবরস্থানের রাস্তা পরিষ্কার রাখার চেষ্টা করি। আমার বিশ্বাস, কেয়ামতের পর আল্লাহ আমাদের সবাইকে পুনরুত্থিত করবেন। সেদিন সবাইকে একসঙ্গে দাঁড়াতে হবে। সেই বিশ্বাস থেকেই আমি এই জায়গাটাকে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখার চেষ্টা করি।”
তাঁর কথাগুলো যেন জীবনের অনিবার্য পরিণতির কথা মনে করিয়ে দেয়। পৃথিবীর ব্যস্ততা, পরিচয়, পদ-পদবি কিংবা সামাজিক অবস্থান—সবকিছুর ঊর্ধ্বে একদিন মানুষকে ফিরে যেতে হবে সৃষ্টিকর্তার কাছে। সেই উপলব্ধি থেকেই মওলা বক্সের এই নিরবচ্ছিন্ন পথচলা।
কবরস্থানের পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখতে গিয়ে কিছু সমস্যার কথাও তুলে ধরেন তিনি। তাঁর ভাষ্য, কয়েকবার ঝাড়ু কিনে কবরস্থানে রেখে দিয়েছেন। কিন্তু পরে আর সেগুলো খুঁজে পাননি। পানির জন্য বোতল ও জগ রেখেছিলেন, সেগুলোও হারিয়ে গেছে। বসতে ও উঠতে সুবিধা হবে ভেবে কয়েকটি ইট রেখেছিলেন, সেগুলোও আর নেই।
এসব ঘটনায় তাঁর কষ্ট হয়। কারণ, নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী যে জিনিসগুলো তিনি কবরস্থানের মানুষের সুবিধার জন্য রেখে যান, সেগুলো হারিয়ে গেলে পরিচ্ছন্নতার কাজ চালিয়ে যাওয়া আরও কঠিন হয়ে পড়ে।
তবে আক্ষেপ থাকলেও দায়িত্ববোধ থেকে সরে আসেননি তিনি। নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন।
তাঁর অনুরোধ, কবরস্থান একটি পবিত্র স্থান। এখানে মানুষ প্রিয়জনদের জন্য দোয়া করতে আসেন। তাই সবার উচিত কবরস্থানের পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখা, যেখানে-সেখানে ময়লা না ফেলা এবং অন্যের রেখে যাওয়া প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নষ্ট বা সরিয়ে না নেওয়া।
বিশেষ করে শুক্রবার জুমার দিনে অনেকে কবরস্থানে আসেন প্রিয়জনদের জন্য দোয়া করতে। তাঁদের জন্য পরিচ্ছন্ন ও সুন্দর পরিবেশ নিশ্চিত করা সবারই দায়িত্ব।
দীর্ঘ সময় ধরে একইভাবে কবরস্থানে আসতে আসতে এখন তাঁর শরীর অনেকটাই ক্লান্ত। আগের মতো কাজ করতে পারেন না। তবুও প্রতিদিন এখানে না এলে যেন নিজের ভেতরে একধরনের অপূর্ণতা অনুভব করেন।
তিনি বলেন, “বয়স হয়েছে। এখন আর আগের মতো পারি না। তারপরও এখানে না এলে ভালো লাগে না। ফজরের নামাজ পড়ে এখানে আসি, স্ত্রীর কবরের কাছে বসি, সবার জন্য দোয়া করি। যতটুকু পারি, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখার চেষ্টা করি। এখানে এলে আমার মন শান্ত হয়।”
তাঁর এই কথার মধ্যে মিশে আছে দীর্ঘদিনের অভ্যাস, প্রিয়জনকে হারানোর বেদনা এবং বিশ্বাসের এক গভীর আশ্রয়।
কবরস্থানে বসে তিনি কখনো কখনো বিভিন্ন ভাষায় কথা বলেন। কবরবাসীদের জন্য দোয়া করতে গিয়ে বিভিন্ন ভাষায় নিজের অনুভূতি প্রকাশেরও চেষ্টা করেন। তাঁর কাছে কবরস্থান কেবল মৃত মানুষের শায়িত থাকার স্থান নয়; এটি স্মৃতি, ভালোবাসা, আত্মীয়তা আর পরকালের কথা স্মরণ করার এক নীরব প্রাঙ্গণ।
বর্তমান সময়ে অনেকেই নিজের ব্যস্ততা ও ব্যক্তিগত জীবনের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ থাকেন। অথচ অ্যাডভোকেট মওলা বক্স বার্ধক্যের ক্লান্ত শরীর নিয়েও প্রতিদিন যে কাজটি করে চলেছেন, তা আমাদের সামনে এক অনন্য মানবিক দৃষ্টান্ত হয়ে আছে।
তিনি কোনো প্রতিষ্ঠানের পরিচ্ছন্নতাকর্মী নন। কেউ তাঁকে এই কাজের দায়িত্ব দিয়েছেন, এমন তথ্যও নেই। নিজের অনুভূতি, বিশ্বাস ও দায়িত্ববোধ থেকেই তিনি কাজটি করে চলেছেন।
এক হাতে লাঠি, অন্য হাতে ডালপালার ঝাড়ু—এই দৃশ্যের ভেতরে লুকিয়ে আছে এক স্বামীর স্ত্রীর প্রতি গভীর ভালোবাসা, মৃতদের প্রতি শ্রদ্ধা এবং জীবনের শেষ পরিণতি সম্পর্কে সচেতন থাকার শিক্ষা।
স্ত্রীর কবরের পাশে বসে থাকা মানুষটি যেন নীরবে আমাদের মনে করিয়ে দেন, পৃথিবীতে মানুষের সম্পর্ক শুধু জীবিত অবস্থার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। স্মৃতি, শ্রদ্ধা, প্রার্থনা ও ভালোবাসার মধ্য দিয়েও মানুষ প্রিয়জনকে হৃদয়ে বাঁচিয়ে রাখতে পারে।
অ্যাডভোকেট মওলা বক্সের এই দীর্ঘ পথচলা তাই কেবল একটি কবরস্থান পরিষ্কার রাখার গল্প নয়; এটি ভালোবাসার, বিশ্বাসের, মানবিকতার এবং মৃত্যুকে স্মরণ করে জীবনের মূল্য উপলব্ধি করার এক অনন্য গল্প।
যে হাতে একদিন জীবনের নানা দায়িত্ব সামলেছেন, আজ সেই হাতের একটিতে লাঠি, অন্যটিতে ডালপালার ঝাড়ু। শরীর দুর্বল হয়েছে, সময় বদলেছে; কিন্তু স্ত্রীর প্রতি ভালোবাসা আর কবরবাসীদের জন্য দোয়া করার অভ্যাস বদলায়নি। নীরবে, নিভৃতে, প্রতিদিন—তিনি যেন নিজের কাজের মধ্য দিয়েই বলে চলেছেন, ভালোবাসা কখনো শেষ হয় না।