কুমিল্লার লালমাইয়ে ধানক্ষেতের পাশ থেকে উদ্ধার হওয়া সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী জান্নাতুল তাজমিনকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। এ ঘটনায় সুমন মিয়া (৩৫) নামে এক সিএনজিচালককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পুলিশের দাবি, জিজ্ঞাসাবাদে তাজমিনকে ধর্ষণ ও হত্যার কথা স্বীকার করেছেন তিনি। তাঁর দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে নিহতের ব্যবহৃত আইফোনও উদ্ধার করা হয়েছে।
শনিবার (১০ অক্টোবর) সকালে কুমিল্লা জেলা পুলিশ সুপারের কার্যালয়ের সম্মেলনকক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান অতিরিক্ত পুলিশ সুপার পংকজ বড়ুয়া।
পুলিশ জানায়, গত ৮ অক্টোবর সকালে লালমাই উপজেলার ভোরাজগৎপুর উত্তরপাড়া গ্রামের একটি ধানক্ষেতের আইলের পাশ থেকে এক কিশোরীর মরদেহ উদ্ধারের খবর জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এর মাধ্যমে পায় পুলিশ। পরে লালমাই থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে মরদেহ উদ্ধার করে। নিহতের বাবা মরদেহটি শনাক্ত করেন।
নিহত জান্নাতুল তাজমিন যশোর জেলার বাসিন্দা। বাবার চাকরির সুবাদে পরিবারের সঙ্গে কুমিল্লা নগরীর রেসকোর্স এলাকায় বসবাস করত সে। তাজমিন নগরীর ফরিদা বিদ্যায়তনের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল।
এ ঘটনায় লালমাই থানায় হত্যা মামলা করা হয়। মামলার তদন্তে জেলা গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) ও থানা পুলিশ যৌথভাবে কাজ শুরু করে। তদন্তের একপর্যায়ে সিএনজিচালক সুমন মিয়াকে চট্টগ্রাম থেকে গ্রেপ্তার করা হয়।
যেভাবে ঘটে হত্যাকাণ্ড
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, গত ৮ অক্টোবর রাত সাড়ে ১২টার দিকে তাজমিন পদুয়ার বাজার বিশ্বরোড এলাকার তিশা বাস কাউন্টারের সামনে থেকে রেসকোর্সের বাসায় যাওয়ার জন্য একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশা ভাড়া করে। চালক সুমন মিয়ার সঙ্গে ৩০০ টাকা ভাড়া ঠিক হয়। অটোরিকশায় ওঠার পর কিছু দূর গিয়ে চালককে ১০০ টাকা দিয়ে কলা ও রুটি কিনে আনে তাজমিন।
পুলিশ জানায়, শর্টকাট পথে গন্তব্যে পৌঁছে দেওয়ার কথা বলে সুমন নূরজাহান হোটেলের সামনে থেকে ইউটার্ন নিয়ে চাঁদপুরগামী সড়ক ধরে লাকসাম উপজেলার বিজরা বাজার হয়ে অন্যদিকে চলে যান। পরে অটোরিকশাটি একটি নির্জন ও অন্ধকার স্থানে থামান তিনি।
জায়গাটি রেসকোর্স নয় বুঝতে পেরে তাজমিন ভীত হয়ে চালকের কাছে জানতে চায়, তাকে কোথায় নিয়ে আসা হয়েছে। এ সময় সুমন তাকে জানায়, এটি রেসকোর্স নয়, অন্য জায়গা।
পুলিশের দাবি, তাজমিন অটোরিকশা থেকে নেমে পালানোর চেষ্টা করলে সুমন তাকে আটকান এবং ধর্ষণের চেষ্টা করেন। তাজমিন চিৎকার শুরু করলে তিনি গামছা দিয়ে তার গলা পেঁচিয়ে ধরেন। একপর্যায়ে ধস্তাধস্তির পর তাজমিন দুর্বল হয়ে পড়ে।
পুলিশ আরও জানায়, জিজ্ঞাসাবাদে সুমন তাজমিনকে ধর্ষণের কথা স্বীকার করেছেন বলে তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। পরে তাকে ধানক্ষেতে নিয়ে উপুড় করে শুইয়ে মাথা পা দিয়ে চেপে ধরে মৃত্যু নিশ্চিত করেন বলে পুলিশের ভাষ্য। এরপর তাজমিনের হাতব্যাগ থেকে আইফোন নিয়ে ব্যাগটি ধানক্ষেতে ফেলে রেখে অটোরিকশাটি ঘটনাস্থলে রেখে চলে যান তিনি।
পুকুরে গোসল করে চট্টগ্রামে পালিয়ে যান
পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ঘটনাস্থল থেকে চলে যাওয়ার পর সুমন স্থানীয় কাচিকাটা মসজিদের সামনে একটি পুকুরে গোসল করেন। পরে ভাড়ায় চালিত অন্য একটি সিএনজিতে করে বাখরাবাদ এলাকায় যান। সেখানে একটি পুকুরপাড়ের জঙ্গলে তাজমিনের কাছ থেকে নেওয়া আইফোনটি লুকিয়ে রেখে চট্টগ্রামে চলে যান তিনি।
পরদিন ৯ অক্টোবর চট্টগ্রাম থেকে সুমনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। পরে তাঁর দেওয়া তথ্য ও দেখানো স্থান অনুযায়ী বাখরাবাদ এলাকার পুকুরপাড়ের জঙ্গল থেকে তাজমিনের ব্যবহৃত আইফোনটি উদ্ধার করা হয়।
এ ঘটনায় গ্রেপ্তার সুমন মিয়ার বিরুদ্ধে আইনগত কার্যক্রম চলমান রয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
সংবাদ সম্মেলনে লালমাই থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মিজানসহ জেলা পুলিশের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।