৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:৫৯ পূর্বাহ্ন
অনলাইন সংস্করণ

গোমতী নদী কুমিল্লার প্রাণ প্রবাহ

—— মতিন সৈকত 
“কুমিল্লা শ্যামল মায়া মেঘনা উদাস
কণ্ঠে তার মনিহার গোমতী তিতাস”
বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ। অসংখ্য নদী, উপনদী, শাখা নদী, খাল-বিল ও জলাভূমি এ দেশের ভূপ্রকৃতি, কৃষি, অর্থনীতি, জীববৈচিত্র্য ও মানুষের জীবনযাত্রাকে যুগ যুগ ধরে সমৃদ্ধ করে আসছে। নদী শুধু পানির প্রবাহ নয়—নদী বাংলাদেশের প্রকৃতি, সংস্কৃতি, কৃষি, মৎস্যসম্পদ, যোগাযোগ ও মানুষের জীবন-জীবিকার অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাই নদীকে বাংলাদেশের প্রাণপ্রবাহ বলা হয়।
এই নদীমাতৃক বাংলাদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ জনপদ কুমিল্লা। কুমিল্লার ভূপ্রকৃতি ও জনজীবনের সঙ্গে নদ-নদীর সম্পর্ক অত্যন্ত নিবিড়। বিশেষ করে গোমতী নদী কুমিল্লার অন্যতম প্রধান প্রাণপ্রবাহ। ভারতের ত্রিপুরা থেকে প্রবাহিত হয়ে গোমতী কুমিল্লার জনপদ, কৃষি ও অর্থনীতির ওপর দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব রেখে চলেছে। এর পাশাপাশি মেঘনা, তিতাস, ডাকাতিয়া, কাঁঠালিয়া, ধনাগোদা, খিরাই, কালাডুমুরসহ বিভিন্ন নদী, শাখানদী ও জলধারা কুমিল্লার প্রকৃতি ও মানুষের জীবনকে বহুমাত্রিকভাবে প্রভাবিত করেছে।
কুমিল্লার নদ-নদীর সংখ্যা সরকারি তথ্য অনুযায়ী ৪৪টি। তথ্যের বাইরেও থাকতে পারে। এছাড়াও অসংখ্য বিল,জলাশয়, খাল সহ জলের বড় বড় অধাঁর রয়েছে।
নদীর পানি কৃষিজমিতে সেচের জোগান দেয়, পলি জমিকে উর্বর করে এবং মাছসহ নানা জলজ সম্পদের আবাস সৃষ্টি করে। নদী ও জলাভূমিকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে কৃষি, মৎস্য, নৌ-যোগাযোগ, বাজার-বাণিজ্য এবং অসংখ্য মানুষের জীবিকা। কুমিল্লার গ্রামীণ জনপদে নদী-খাল-বিলের সঙ্গে মানুষের জীবন, লোকসংস্কৃতি, গান, কবিতা, উৎসব ও ঐতিহ্যেরও গভীর সম্পর্ক রয়েছে।
কিন্তু দখল, দূষণ, অপরিকল্পিত বাঁধ ও অবকাঠামো, নাব্যতা হ্রাস এবং প্রাকৃতিক জলপ্রবাহের বাধাগ্রস্ততার কারণে দেশের অনেক নদীর মতো কুমিল্লার নদ-নদীও নানা সংকটে রয়েছে। নদী হারালে শুধু একটি জলধারা হারায় না, ক্ষতিগ্রস্ত হয় কৃষি, মৎস্য, জীববৈচিত্র্য, পরিবেশ এবং মানুষের জীবন-জীবিকা।
তাই কুমিল্লার নদ-নদীকে রক্ষা করা মানে কেবল পানি সংরক্ষণ নয়—এটি কৃষি, পরিবেশ, অর্থনীতি, জীববৈচিত্র্য ও মানুষের ভবিষ্যৎ রক্ষার কাজ। নদীর দখল ও দূষণ বন্ধ, নাব্যতা ফিরিয়ে আনা, খাল-জলাশয়ের সংযোগ পুনঃস্থাপন এবং নদীকেন্দ্রিক পরিকল্পিত উন্নয়নই পারে কুমিল্লার প্রাণপ্রবাহকে সচল রাখতে।
নদী বাঁচলে কুমিল্লা বাঁচবে, নদী বাঁচলে বাংলাদেশ বাঁচবে। নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ও জীবন্ত জলধারাই হতে পারে পরিবেশবান্ধব, সমৃদ্ধ, টেকসই ও নিরাপদ বাংলাদেশের অন্যতম ভিত্তি।
গোমতী নদীর নামকরণ সম্পর্কে নিশ্চিত ঐতিহাসিক দলিল অপ্রতুল। প্রচলিত লোকবিশ্বাসে ঋষি বশিষ্ঠের কন্যা গোমতীর নামানুসারে নদীটির নাম ‘গোমতী’ হয়েছে বলে উল্লেখ পাওয়া যায়। অন্যদিকে ত্রিপুরার স্থানীয় লোক কথায় ‘খুমতুই’ নাম থেকে কালক্রমে ‘গোমতী’ নামের উৎপত্তির কথাও বলা হয়। ‘গোমতী’ একটি প্রাচীন সংস্কৃত শব্দ; এর অর্থের সঙ্গে গো-সম্পদ বা গাভীর সমৃদ্ধতার ধারণা যুক্ত।” এর বাইরেও অন্য তথ্য উপাত্ত লোককথা থাকতে পারে।
গোমতী নদীর উৎপত্তি ত্রিপুরা
১. উৎসভূমি ও ডুম্বুর
ত্রিপুরার লংথরাই ও আঠারামুড়া পাহাড়শ্রেণির দক্ষিণাংশে গোমতী নদীর জলধারা গড়ে ওঠে। রাইমা ও সারমা নদীধারা মিলিত হয়ে গোমতী নদীর প্রধান প্রবাহ সৃষ্টি করে। ত্রিপুরা সরকারের গোমতী জেলা-সংক্রান্ত তথ্য অনুযায়ী, ডুম্বুর লেক রাইমা ও সারমা নদীর মিলনস্থল,এখানকার তীর্থমুখ অঞ্চলকে গোমতী নদীর উৎপত্তিস্থল হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
২. ডুম্বুর থেকে অমরপুর
ডুম্বুর জলাধার ও তীর্থমুখ অতিক্রম করে নদীটি পশ্চিমমুখী হয়ে অমরপুর অঞ্চলের দিকে প্রবাহিত হয়। এই অংশে নদীটি পাহাড়ি উপত্যকা, গিরিখাত ও বনাঞ্চলের মধ্য দিয়ে এগিয়েছে। অমরপুরের ছবিমুড়া গোমতী নদীর তীরের একটি উল্লেখযোগ্য স্থান। ত্রিপুরা সরকারের পর্যটন তথ্যেও ছবিমুড়াকে গোমতী নদীর তীরবর্তী স্থান হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
৩. অমরপুর থেকে উদয়পুর
এরপর গোমতী নদী অমরপুর অতিক্রম করে উদয়পুরের দিকে প্রবাহিত হয়। উদয়পুর শহর গোমতী নদীর সঙ্গে ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিকভাবে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত। ত্রিপুরা সরকারের গোমতী জেলা ওয়েবসাইটে উদয়পুরকে গোমতী নদীর তীরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ শহর হিসেবে দেখানো হয়েছে।
উদয়পুরের কাছাকাছি গোমতী নদীর তীরেই রয়েছে ঐতিহাসিক ত্রিপুরা সুন্দরী মন্দির ও মাতাবাড়ি এলাকা। নদীটি স্থানীয় ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক জীবনেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
৪. উদয়পুর থেকে সোনামুড়া
উদয়পুরের পর নদীটি আরও পশ্চিম দিকে অগ্রসর হয়ে সোনামুড়া অঞ্চলে পৌঁছায়। ভারতের সরকারি ভূগর্ভস্থ জলসম্পদ-সংক্রান্ত প্রতিবেদনে গোমতী নদীর প্রবাহপথ হিসেবে অমরপুর → উদয়পুর → সোনামুড়া উল্লেখ করা হয়েছে।
৫. সোনামুড়া থেকে বাংলাদেশ
সোনামুড়া শহরের পাশ দিয়ে গোমতী নদী পশ্চিমমুখে প্রবাহিত হয়ে ভারত-বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক সীমান্ত অতিক্রম করে বাংলাদেশে প্রবেশ করে। এরপর এটি বাংলাদেশের কুমিল্লা অঞ্চলের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে শেষ পর্যন্ত মেঘনা নদীর সঙ্গে যুক্ত হয়।
দৈর্ঘ্য নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য
এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। বিভিন্ন সরকারি ও গবেষণা সূত্রে ত্রিপুরার অংশের দৈর্ঘ্য ১৩৩ কিমি এবং ১৬৭.৪ কিমি—দুই ধরনের সংখ্যা পাওয়া যায়।
ত্রিপুরায় গোমতীর দৈর্ঘ্য—এক সরকারি প্রতিবেদনে
প্রায় ১৩৩ কিমি উৎস থেকে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত পর্যন্ত। অন্য গবেষণায় প্রায় ১৬৭.৪ কিমি।
ত্রিপুরায় গোমতী অববাহিকা প্রায় ২,৪৯২ বর্গকিমি।
ত্রিপুরার মোট ভৌগোলিক এলাকার অংশ
প্রায় ২২.৬৬%।
পাহাড়ি অববাহিকা প্রায় ১,৯২১ বর্গকিমি।
সমতল অববাহিকা প্রায় ৫৭১ বর্গকিমি।
ত্রিপুরার Central Ground Water Board-এর সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে গোমতীর দৈর্ঘ্য প্রায় ১৩৩ কিমি এবং অববাহিকা ২,৪৯২ বর্গকিমি বলা হয়েছে। একই প্রতিবেদনে গোমতীকে ত্রিপুরার সবচেয়ে বড় নদী অববাহিকা হিসেবে দেখানো হয়েছে।
অন্যদিকে গবেষণাভিত্তিক একাধিক সূত্রে উৎস থেকে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত পর্যন্ত ১৬৭.৪ কিমি বলা হয়েছে এবং অববাহিকার আয়তনও প্রায় ২,৪৯২ বর্গকিমি উল্লেখ করা হয়েছে।
“ত্রিপুরার লংথরাই–আঠারামুড়া পাহাড়শ্রেণির দক্ষিণাংশে রাইমা ও সারমা নদীর মিলনধারা থেকে গোমতী নদীর উৎপত্তি। ডুম্বুর, অমরপুর ও উদয়পুর অতিক্রম করে নদীটি পশ্চিমমুখে সোনামুড়ার পাশ দিয়ে প্রবাহিত হয়ে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত অতিক্রম করে কুমিল্লায় প্রবেশ করেছে। ত্রিপুরায় নদীটির দৈর্ঘ্য বিভিন্ন উৎসে প্রায় ১৩৩ থেকে ১৬৭.৪ কিলোমিটার হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এর অববাহিকা প্রায় ২,৪৯২ বর্গকিলোমিটার এবং এটি ত্রিপুরার বৃহত্তম নদী অববাহিকা।”
আর একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হলো, সোনামুড়া থেকে কুমিল্লা/দাউদকান্দি পর্যন্ত গোমতীর আন্তঃসীমান্ত নৌপথের দূরত্ব নিয়ে আলাদা হিসাব আছে। একটি গবেষণা-মানচিত্রে মহারানী ব্যারেজ–সোনামুড়া অংশ প্রায় ১১৬ কিমি এবং ভারতীয় সীমান্ত থেকে কুমিল্লা পর্যন্ত গোমতীর অংশ প্রায় ১০.২ কিমি দেখানো হয়েছে। দাউদকান্দি থেকে সোনামুড়া নৌপথের দূরত্ব প্রায় ৯৩ কিমি বলেও সংবাদ প্রতিবেদনে
কুমিল্লার ইতিহাস-ঐতিহ্য, জনজীবন, কৃষি, অর্থনীতি, যোগাযোগ, সামাজিক সম্পর্ক, রাজনৈতিক বাস্তবতা এবং লোক সংস্কৃতির সঙ্গে গোমতী নদীর সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর। মেঘনা-গোমতীর গতিপ্রকৃতি কুমিল্লার মানুষের আচার-আচরণ, খাদ্যাভ্যাস, ভাষা ও সংস্কৃতিতে প্রভাব ফেলেছে।
কুমিল্লার জনজীবনে গোমতী নদীর প্রভাব
রাজনীতি, অর্থনীতি, সংস্কৃতি ও লোকজ উৎসবের জীবনধারা বহমান।
নদী শুধু জলধারা নয়। নদী একটি জনপদের ইতিহাস, অর্থনীতি, সংস্কৃতি, যোগাযোগ, কৃষি, জীববৈচিত্র্য ও মানুষের জীবনযাত্রার অবিচ্ছেদ্য অংশ। বাংলাদেশের নদীমাতৃক ভূপ্রকৃতিতে অসংখ্য জনপদের মতো কুমিল্লার ইতিহাসও নদীকে কেন্দ্র করে বিকশিত হয়েছে। আর সেই নদীগুলোর মধ্যে গোমতী সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে গোমতী নদীর ভূমিকা
 মূলত কুমিল্লা অঞ্চলের ভৌগোলিক অবস্থান, মুক্তিযোদ্ধাদের চলাচল, সামরিক অভিযান, সীমান্তসংযোগ এবং জনসাধারণের নিরাপদ আশ্রয় ও যাতায়াতের সঙ্গে যুক্ত। বিশেষ করে ১৯৭১ সালের ডিসেম্বরের চূড়ান্ত যুদ্ধপর্বে গোমতী নদী কুমিল্লা শহর অভিমুখী মুক্তিযোদ্ধা ও মিত্রবাহিনীর অভিযানের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভৌগোলিক উপাদান ছিল।
বাংলাদেশের স্বাধীনতার যুদ্ধে গোমতী নদীর অবদান
১. সীমান্তের প্রাকৃতিক যোগাযোগ পথ
গোমতী নদী কুমিল্লা অঞ্চলের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে ভারতের ত্রিপুরার সঙ্গে ভৌগোলিক সংযোগ তৈরি করেছে। ১৯৭১ সালে কুমিল্লা ছিল মুক্তিযুদ্ধের একটি গুরুত্বপূর্ণ সীমান্তবর্তী অঞ্চল। ফলে নদী ও নদীসংলগ্ন ভূপ্রকৃতি মুক্তিযোদ্ধাদের চলাচল ও সীমান্তের সঙ্গে যোগাযোগের ক্ষেত্রে কৌশলগত গুরুত্ব বহন করেছিল।
২. মুক্তিযোদ্ধাদের চলাচল ও অভিযান
গোমতী নদীর তীরবর্তী এলাকা মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন পর্যায়ে মুক্তিযোদ্ধাদের কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত ছিল। নদী, খাল-বিল ও জলাভূমির জটিল ভূপ্রকৃতি স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য পরিচিত ভূখণ্ড হিসেবে কাজ করত। একই সঙ্গে এই ভূপ্রকৃতি পাকিস্তানি বাহিনীর চলাচল ও নিয়ন্ত্রণের জন্যও নানা প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করত।
৩. ডিসেম্বরের চূড়ান্ত অভিযানে গোমতী নদী
গোমতী নদীর সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রত্যক্ষ ঘটনাগুলোর একটি ঘটে ১৯৭১ সালের ৭ ডিসেম্বর রাতে। কুমিল্লা বিমানবন্দরে পাকিস্তানি বাহিনীর ঘাঁটিতে মুক্তিযোদ্ধা ও মিত্রবাহিনী আক্রমণ চালায়। বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার ঐতিহাসিক বিবরণ অনুযায়ী, আক্রমণকারী দলগুলোর দুটি দল গোমতী নদী অতিক্রম করে কুমিল্লা শহরের ভাটপাড়া এবং চৌদ্দগ্রামের বাঘেরচর দিক থেকে পাকিস্তানি বাহিনীর অবস্থানের দিকে অগ্রসর হয়।
এই ঘটনা প্রমাণ করে যে, যুদ্ধের শেষ পর্যায়ে গোমতী নদী শুধু একটি নদী ছিল না—এটি সামরিক অভিযানের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূ-প্রাকৃতিক পথ হিসেবেও ব্যবহৃত হয়েছিল।
৪. কুমিল্লা মুক্ত করার অভিযানে পরোক্ষ ভূমিকা
কুমিল্লা ছিল পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানগুলোর একটি। ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহে মিত্রবাহিনী ও মুক্তিযোদ্ধাদের অগ্রযাত্রা দ্রুততর হয়। গোমতী নদী অতিক্রম করে বিভিন্ন দিক থেকে আক্রমণ পরিচালনা কুমিল্লা শহরের দিকে সামরিক চাপ তৈরিতে সহায়তা করে। ৭ ডিসেম্বর রাতের যুদ্ধে ২৬ জন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন বলে বিএসএসের প্রতিবেদনে উল্লেখ আছে।
৫. সীমান্তের ওপারে আশ্রয় ও প্রশিক্ষণের সঙ্গে বৃহত্তর যোগাযোগ
১৯৭১ সালে কুমিল্লা-ত্রিপুরা সীমান্ত দিয়ে বিপুলসংখ্যক মানুষ ভারতে আশ্রয় নেন এবং মুক্তিযুদ্ধের প্রশিক্ষণ ও সংগঠনের সঙ্গে সীমান্তবর্তী অঞ্চলগুলো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। সামগ্রিকভাবে ১৯৭১ সালে প্রায় এক কোটি মানুষ ভারতে আশ্রয় নিয়েছিলেন। ত্রিপুরাও বিপুলসংখ্যক শরণার্থী গ্রহণ করেছিল।
৬. নদী ও স্থানীয় মানুষের প্রতিরোধ
মুক্তিযুদ্ধ ছিল কেবল সামরিক বাহিনীর যুদ্ধ নয়; গ্রামের কৃষক, মাঝি, জেলে, শিক্ষক, ছাত্র, শ্রমজীবী মানুষসহ সাধারণ জনগণও নানা উপায়ে মুক্তিযোদ্ধাদের সহযোগিতা করেছেন। নদী-খালনির্ভর কুমিল্লার জনপদে স্থানীয় নৌযান, নদীপথ ও নদীতীরবর্তী জনবসতি যোগাযোগ ও তথ্য আদান-প্রদানে ভূমিকা রাখার সুযোগ তৈরি করেছিল।
গোমতী নদী: যুদ্ধের ভূগোল থেকে স্বাধীনতার স্মৃতি
গোমতী নদীর মুক্তিযুদ্ধকালীন গুরুত্বকে তিনটি স্তরে দেখা যায়—
প্রথমত—ভূগোল: নদীটি কুমিল্লা ও ত্রিপুরার সীমান্তভূমির সঙ্গে যুক্ত হওয়ায় এটি যুদ্ধের গুরুত্বপূর্ণ ভৌগোলিক অঞ্চলের অংশ ছিল।
দ্বিতীয়ত—সামরিক কৌশল: ডিসেম্বরের চূড়ান্ত অভিযানে মুক্তিযোদ্ধা ও মিত্রবাহিনীর কয়েকটি দল গোমতী নদী অতিক্রম করে পাকিস্তানি বাহিনীর অবস্থানের দিকে অগ্রসর হয়।
তৃতীয়ত—স্মৃতি ও ইতিহাস: কুমিল্লার মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে গোমতী নদী আজও সেই সময়ের প্রতিরোধ, রক্তক্ষয়, সীমান্তসংযোগ এবং বিজয়ের স্মারক হিসেবে বিবেচিত হওয়ার মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক ভূচিহ্ন।
গোমতী নদী নিজে কোনো যুদ্ধরত পক্ষ ছিল না, কিন্তু ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের ভূগোল, যোগাযোগ ও সামরিক অভিযানের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক অবকাঠামো হিসেবে এর ভূমিকা ছিল। বিশেষ করে কুমিল্লা মুক্ত করার চূড়ান্ত অভিযানে গোমতী নদী অতিক্রম করে মুক্তিযোদ্ধা ও মিত্রবাহিনীর অগ্রসর হওয়ার ঘটনা নদীটির মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে প্রত্যক্ষ গুরুত্ব প্রতিষ্ঠা করে।
কুমিল্লার মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস লিখতে তাই “গোমতী নদী ও মুক্তিযুদ্ধ” একটি স্বতন্ত্র অধ্যায় হওয়ার যথেষ্ট ঐতিহাসিক ভিত্তি রয়েছে।
★ভারতের ত্রিপুরার পাহাড়ি অঞ্চল থেকে উৎপন্ন গোমতী কুমিল্লার আদর্শ সদর, বুড়িচং, ব্রাহ্মণপাড়া, দেবিদ্বার, মুরাদনগর, তিতাস ও দাউদকান্দি অঞ্চলের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে মেঘনায় মিলিত হয়েছে।
কুমিল্লা জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশ অংশে গোমতীর দৈর্ঘ্য প্রায় ১৩০.১২২ কিলোমিটার এবং নদীটির দুই তীরে বন্যা ব্যবস্থাপনা বাঁধও রয়েছে।
এই নদী কখনো কুমিল্লার আশীর্বাদ, কখনো দুর্যোগের কারণ। কখনো কৃষকের জীবনরেখা, কখনো বন্যার আতঙ্ক। আবার কখনো প্রেম, স্মৃতি, গান, উৎসব ও লোকজ জীবনের অনুপ্রেরণা। তাই গোমতীকে বাদ দিয়ে কুমিল্লার জনজীবনের পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস লেখা প্রায় অসম্ভব।
১. গোমতী ও কুমিল্লার জনপদের বিকাশ
কুমিল্লার প্রাচীন জনপদ গড়ে ওঠার পেছনে নদী ও জলাভূমির ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। নদীর তীরে মানুষের বসতি স্থাপন সহজ হয়েছে। কৃষির জন্য পানি পাওয়া গেছে, মাছ ও অন্যান্য জলজ সম্পদ মানুষের খাদ্য ও জীবিকার উৎস হয়েছে। আবার নদীপথ যোগাযোগ ও বাণিজ্যের সুযোগ তৈরি করেছে।
কুমিল্লার ইতিহাসে গোমতী তাই শুধু একটি ভৌগোলিক রেখা নয়—এটি জনপদ গঠনের অন্যতম প্রাকৃতিক অবকাঠামো।
গোমতীর তীরবর্তী মানুষের জীবন নদীর পানির ওঠানামার সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে অভিযোজিত হয়েছে। বর্ষায় নদী প্রশস্ত ও স্রোতস্বিনী, শুষ্ক মৌসুমে অনেক স্থানে সংকুচিত—এই ঋতুচক্র কৃষি, মাছ ধরা, নৌযাতায়াত এবং মানুষের দৈনন্দিন কর্মকাণ্ডকে প্রভাবিত করেছে। একসময় আকস্মিক বন্যার কারণে গোমতীকে ‘কুমিল্লার দুঃখ’ বলা হতো। বর্তমানে বাঁধ ও পানি ব্যবস্থাপনার কারণে নদীর সেই ভয়াবহতা অনেকাংশে নিয়ন্ত্রিত হলেও বন্যা ও পাহাড়ি ঢলের ঝুঁকি এখনও রয়েছে।
২. গোমতী ও কুমিল্লার অর্থনীতি
কৃষির জীবনরেখা
গোমতীর সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক প্রভাব কৃষিতে। নদীর পানি, পলি, চর ও নদী তীরবর্তী উর্বর জমি কৃষিকে সমৃদ্ধ করেছে। ধান, শাকসবজি, বিভিন্ন ফসল এবং মৌসুমি কৃষি উৎপাদনে নদীর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ অবদান রয়েছে।
নদীর পানি সেচের কাজে ব্যবহৃত হওয়ায় শুষ্ক মৌসুমে কৃষকের উৎপাদন অব্যাহত রাখা সম্ভব হয়েছে। কুমিল্লা জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের সরকারি তথ্যেও গোমতীর বাঁধকে কৃষি ও সেচের জন্য উপকারী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে এই নদী যেমন কৃষিকে পানি দেয়, তেমনি অতিরিক্ত পানি কৃষকের ক্ষতিও করতে পারে। ২০২৬ সালের জুলাইয়ে উজানের পাহাড়ি ঢল ও টানা বৃষ্টিতে গোমতীর পানি বৃদ্ধি পেয়ে কুমিল্লার চরাঞ্চলের ফসলি জমি প্লাবিত হয় এবং বহু কৃষক আগাম সবজি ও ফসলের ক্ষতির মুখে পড়েন।
অর্থাৎ গোমতীকে ঘিরে কুমিল্লার কৃষি অর্থনীতি মূলত পানি ও বন্যা—এই দুইয়ের ভারসাম্যের ওপর দাঁড়িয়ে আছে।
৩. মাছ ও মৎস্যজীবী সমাজ
গোমতী কেবল কৃষকের নদী নয়। এটি জেলে ও মৎস্যজীবী মানুষেরও জীবিকার উৎস।
২০২৪ সালের Bangladesh Journal of Zoology-তে প্রকাশিত একটি গবেষণায় কুমিল্লা সদর অংশের গোমতীতে ৩৭টি মাছের প্রজাতি শনাক্ত করা হয়েছিল। একই গবেষণায় নদীসংলগ্ন মৎস্যজীবীদের আর্থসামাজিক অবস্থাও বিশ্লেষণ করা হয়। গবেষণাটি একই সঙ্গে বিভিন্ন সময়ে মাছের বৈচিত্র্যের পরিবর্তনের কথাও তুলে ধরে।
ফলে নদীর পানি, মাছ, চর, ঘাট ও বাজার—সব মিলিয়ে গোমতী একটি বহুমাত্রিক জীবিকা-ব্যবস্থার সৃষ্টি করেছে।
জেলেদের জীবন নদীর সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। নদীতে মাছ পাওয়া গেলে বাজারে মাছের সরবরাহ বাড়ে। মাছ ব্যবসা, পরিবহন, খুচরা বিক্রি ও খাদ্য সংস্কৃতির সঙ্গে তার সম্পর্ক তৈরি হয়। ফলে গোমতীর প্রভাব মৎস্যজীবীর নৌকা থেকে শুরু করে শহরের বাজারের খাবারের টেবিল পর্যন্ত বিস্তৃত।
৪. নদীপথ, বাণিজ্য ও বাজার অর্থনীতি
আধুনিক সড়ক ও রেল যোগাযোগের আগে নদীপথ ছিল পণ্য ও মানুষের চলাচলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। গোমতীও একসময় কুমিল্লার বাণিজ্যিক যোগাযোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ জলপথ ছিল।
নদীপথে কৃষিপণ্য, মাছ, নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যসহ নানা ধরনের পণ্য পরিবহন করা হতো। নদীর ঘাটকে কেন্দ্র করে স্থানীয় বাজার ও বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ডের বিকাশ ঘটেছিল। ঐতিহাসিক বিবরণে গোমতীকে কুমিল্লা শহরের বাণিজ্যিক জীবনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত একটি জলপথ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
নদী যখন নাব্য ছিল, তখন নৌকা ছিল শুধু যাতায়াতের বাহন নয়—এটি ছিল অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের চলমান অবকাঠামো।
আজ নাব্যতা কমে যাওয়ায় সেই নদীকেন্দ্রিক অর্থনীতির বড় অংশ হারিয়ে গেছে। বৃহৎ নৌযান চলাচলের উপযোগী নাব্যতা অনেকাংশে আর নেই বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
৫. গোমতী ও কুমিল্লার রাজনৈতিক জীবন
গোমতীর রাজনৈতিক প্রভাবও উপেক্ষা করার মতো নয়।
একদিকে নদী ও তার বাঁধ রক্ষা ছিল জননিরাপত্তার প্রশ্ন; অন্যদিকে নদীর তীর, চর, খাসজমি, বালু-মাটি, ঘাট ও দখলকে কেন্দ্র করে স্থানীয় ক্ষমতার নানা সমীকরণ তৈরি হয়েছে।
বিশেষ করে নদী দখল, মাটি ও বালু উত্তোলন, বাঁধ রক্ষা এবং নদীর প্রবাহ বজায় রাখা—এসব বিষয় স্থানীয় প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক নেতৃত্ব, ব্যবসায়ী এবং নদীতীরবর্তী জনগণের স্বার্থের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে।
পুরাতন গোমতীকে ঘিরে দখল ও রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগ বিভিন্ন সময়ে সংবাদমাধ্যমে এসেছে। ২০১৮ সালের একটি প্রতিবেদনে পুরাতন গোমতীর তীর ও জলভাগ দখলের সঙ্গে স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাবের বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছিল।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—নদীকে কেন্দ্র করে রাজনীতি শুধু নির্বাচনকেন্দ্রিক রাজনীতি নয়। এটি পানি, জমি, কৃষি, পরিবেশ, যোগাযোগ, বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও জনস্বার্থের রাজনীতিও।
৬. গোমতী ও শহর রক্ষার ইতিহাস
কুমিল্লা শহরের সঙ্গে গোমতীর সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হলো শহর রক্ষার জন্য নদীর গতিপথ পরিবর্তন।
অতীতে বর্ষায় গোমতীর পানি দ্রুত বৃদ্ধি পেলে শহর প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা থাকত। এই পরিস্থিতিতে বিংশ শতাব্দীর ষাটের দশকে শহর রক্ষার জন্য বাঁধ ও নদী ব্যবস্থাপনায় বড় পরিবর্তন আনা হয়। এর ফলে শহরের পাশ দিয়ে প্রবাহিত পুরনো অংশের একটি অংশ পরে ‘পুরাতন গোমতী’ বা ‘মরা গোমতী’ নামে পরিচিত হয়।
এটি কুমিল্লার জনজীবনে একটি বড় পরিবর্তন ঘটায়।
একদিকে শহরকে বন্যার ঝুঁকি থেকে রক্ষা করার প্রচেষ্টা জোরদার হয়, অন্যদিকে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ, পুরনো ঘাট, নদীকেন্দ্রিক জীবন এবং ঐতিহ্যের একটি অংশ হারিয়ে যেতে থাকে।
৭. গোমতী ও কুমিল্লার সংস্কৃতি
কুমিল্লার সংস্কৃতির সঙ্গে গোমতীর সম্পর্ক বহুমাত্রিক।
সরকারি জেলা তথ্য অনুযায়ী মেঘনা-গোমতীর গতিপ্রকৃতি এবং কুমিল্লার ভূপ্রকৃতি মানুষের আচার-আচরণ, খাদ্যাভ্যাস, ভাষা ও সংস্কৃতিতে ব্যাপক প্রভাব ফেলেছে।
নদী মানুষের ভাষায় এসেছে, গানে এসেছে, কবিতায় এসেছে, স্মৃতিতে এসেছে। নদীর ঘাট, নৌকা, মাঝি, জেলে, চর, বর্ষা, ঢেউ, কাশফুল, কাদামাটি—এসব শুধু প্রকৃতির উপাদান নয়; এগুলো কুমিল্লার লোকজ কল্পনার অংশ।
নদীকে ঘিরে গড়ে ওঠা জীবনধারার মধ্যে রয়েছে—
নৌযাত্রা,
মাঝি ও জেলে সম্প্রদায়ের পেশা,
নদীর ঘাটকেন্দ্রিক সামাজিক যোগাযোগ,
নদীতীরের হাট-বাজার,
বর্ষাকেন্দ্রিক জীবন,
মাছ ও নদীকেন্দ্রিক খাদ্যসংস্কৃতি,
নৌকা, বৈঠা ও নদীকে ঘিরে লোকগান,
নদীতীরবর্তী প্রেম, বিরহ ও স্মৃতিচর্চা,
নদীভাঙন ও বন্যার অভিজ্ঞতা।
অর্থাৎ গোমতী কুমিল্লার ভৌগোলিক পরিচয়কে সাংস্কৃতিক পরিচয়ে রূপান্তরিত করেছে।
৮. লোকজ উৎসব ও নদীকেন্দ্রিক সামাজিক জীবন
বাংলার লোকজ সংস্কৃতিতে নদী বরাবরই উৎসব ও মিলনমেলার গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। কুমিল্লার ক্ষেত্রেও নদীতীরবর্তী জনপদে ধর্মীয় ও সামাজিক অনুষ্ঠান, মেলা, নৌযাত্রা, হাট-বাজার এবং মৌসুমি আনন্দ-আয়োজনের সঙ্গে নদীর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সম্পর্ক রয়েছে।
বিশেষ করে বর্ষাকাল নদীকেন্দ্রিক মানুষের জীবনে আলাদা আবহ তৈরি করে। নদীতে পানি বাড়ে, নৌকা চলাচল বাড়ে, মাছের প্রাপ্যতা পরিবর্তিত হয়, চর ও নদীতীরের দৃশ্য বদলে যায়। ফলে ঋতুভিত্তিক লোকজ জীবনও পরিবর্তিত হয়।
নদীকে কেন্দ্র করে নৌকা ও নৌযাত্রার যে ঐতিহ্য ছিল, তা লোকসংস্কৃতিতে নানা রূপে প্রতিফলিত হয়েছে। মাঝিদের গান, নদীর পাড়ের আড্ডা, হাটের দিন, নৌকায় পণ্য আনা-নেওয়া এবং নদীতীরের সামাজিক মিলন—সব মিলিয়ে নদী ছিল একটি প্রাকৃতিক সামাজিক মঞ্চ।
তবে নির্দিষ্ট কোনো উৎসবকে সরাসরি ‘গোমতী নদীর উৎসব’ হিসেবে উল্লেখ করার ক্ষেত্রে স্থানীয় ঐতিহাসিক ও নৃতাত্ত্বিক প্রমাণ প্রয়োজন। তাই নদীকেন্দ্রিক সাধারণ লোকজ ঐতিহ্য ও কুমিল্লার নির্দিষ্ট উৎসবকে আলাদা করে দেখা জরুরি।
৯. গোমতী ও কুমিল্লার খাদ্য সংস্কৃতি
নদী মানুষের খাদ্যাভ্যাসেও প্রভাব ফেলে।
গোমতী অববাহিকার মাছ দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয় খাদ্যসংস্কৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। মাছের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জেলে, মাছ ব্যবসায়ী, বাজার, রান্নার ঐতিহ্য এবং পারিবারিক খাদ্যাভ্যাস।
এছাড়া নদীর পলি ও পানি কৃষিকে সহায়তা করায় নদীতীরবর্তী অঞ্চলে উৎপাদিত ধান, শাকসবজি ও অন্যান্য কৃষিপণ্য স্থানীয় খাদ্যব্যবস্থাকে সমৃদ্ধ করেছে।
ফলে গোমতীর অর্থনীতি কেবল বাজারের টাকা-পয়সায় সীমাবদ্ধ নয়; এটি কুমিল্লার খাদ্যনিরাপত্তা ও খাদ্যসংস্কৃতির সঙ্গেও যুক্ত।
১০. নদী ও মানুষের সামাজিক সম্পর্ক
গোমতী নদীর তীরে বসবাসকারী মানুষের মধ্যে নদী একটি সামাজিক পরিচয়েরও অংশ।
একই ঘাট ব্যবহার করা, একই নদীতে মাছ ধরা, একই নদীর পানি দিয়ে কৃষি করা, একই বন্যার মুখোমুখি হওয়া—এসব অভিজ্ঞতা মানুষের মধ্যে এক ধরনের অভিন্ন সামাজিক স্মৃতি তৈরি করে।
বন্যার সময় মানুষ একে অপরকে সহযোগিতা করে; নদীর পাড় রক্ষায় স্থানীয় উদ্যোগ দেখা যায়। আবার নদী দখল বা দূষণের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিবাদও গড়ে উঠতে পারে।
এ কারণে গোমতী কেবল প্রকৃতির সম্পদ নয়—এটি একটি সামাজিক সম্পদ ও সামষ্টিক স্মৃতির ভাণ্ডার।
১১. গোমতী ও কুমিল্লার সাহিত্য
নদী বাংলার সাহিত্যের চিরন্তন বিষয়। কুমিল্লার ক্ষেত্রেও গোমতী স্থানীয় সাহিত্যিক ও সাংস্কৃতিক চেতনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক।
নদী এখানে কখনো মায়ের মতো, কখনো প্রেমিকার মতো, কখনো জীবিকার সহচর, আবার কখনো দুর্যোগের প্রতীক।
নদীর ঢেউ, বর্ষার জল, নৌকা, মাঝি, ঘাট, চর, কাশবন, নদীর পাড়ের সন্ধ্যা—এসব দৃশ্য কবিতা, গল্প, স্মৃতিকথা ও লোকসাহিত্যের উপাদান হয়ে উঠতে পারে।
ফলে গোমতী কুমিল্লার মানুষের দৃশ্যমান ভূগোলের পাশাপাশি কল্পনার ভূগোলও নির্মাণ করেছে।
১২. গোমতী ও পরিবেশ-জীববৈচিত্র্য
নদী একটি পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেশব্যবস্থা। গোমতীর পানি, চর, পাড়, জলজ উদ্ভিদ, মাছ, পাখি ও অন্যান্য প্রাণী মিলে একটি নদীকেন্দ্রিক জীববৈচিত্র্য গড়ে উঠেছে।
কিন্তু নদীর নাব্যতা হ্রাস, দখল, দূষণ, পলিজমা, প্লাস্টিক-পলিথিন, অপরিকল্পিত মাটি উত্তোলন এবং নদীতীরের পরিবর্তনের কারণে এই প্রতিবেশব্যবস্থা চাপের মধ্যে রয়েছে।
পুরাতন গোমতীতে প্লাস্টিক, পলিথিন ও বর্জ্য জমে দূষণের সমস্যার কথা সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
অন্যদিকে ২০২৬ সালের একটি প্রতিবেদনে গোমতীর দুই পাড় ও চর থেকে মাটি কাটার ফলে বাঁধ, ফসলি জমি ও পরিবেশের ভারসাম্য ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার অভিযোগ উঠে এসেছে।
নদী রক্ষা তাই শুধু পানি রক্ষার বিষয় নয়।এটি মাছ, পাখি, কৃষি, মাটি, জলাভূমি এবং মানুষের ভবিষ্যৎ রক্ষার বিষয়।
১৩. গোমতীর দুই রূপ—আশীর্বাদ ও অভিশাপ
গোমতীর জীবনদর্শনের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হলো এর দ্বৈত চরিত্র।
যখন গোমতী আশীর্বাদ
কৃষিকে পানি দেয়;
মাটির উর্বরতা বাড়ায়,
মাছের আবাসস্থল সৃষ্টি করে,
কৃষক ও জেলের জীবিকা দেয়,
নদীপথে যোগাযোগ ও বাণিজ্যকে সহায়তা করে।
পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখে।
মানুষের বিনোদন ও সাংস্কৃতিক চর্চার ক্ষেত্র তৈরি করে।
কুমিল্লার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য বৃদ্ধি করে।
যখন গোমতী দুর্যোগ
পাহাড়ি ঢলে পানি দ্রুত বাড়তে পারে,
চর ও নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হতে পারে,
ফসল নষ্ট হতে পারে,
বাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হলে জনপদ বিপন্ন হতে পারে,
নদীভাঙন ও ভূমিক্ষয়ের আশঙ্কা সৃষ্টি হতে পারে।
২০২৬ সালের বর্ষায় উজানের পাহাড়ি ঢল ও বৃষ্টিতে গোমতীর পানি বেড়ে চরাঞ্চলের ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঘটনাই নদীর এই দ্বৈত চরিত্রের সাম্প্রতিক উদাহরণ।
১৪. পুরাতন গোমতী—হারানো ঐতিহ্যের প্রতিচ্ছবি
কুমিল্লা শহরের সঙ্গে পুরাতন গোমতীর সম্পর্ক বিশেষভাবে আবেগঘন।
যে নদী একসময় শহরের প্রাণের অংশ ছিল, তার একটি অংশ আজ নাব্যতা হারিয়ে দূষণ ও দখলের সমস্যায় আক্রান্ত। সংবাদ প্রতিবেদনে পুরাতন গোমতীর তীর দখল এবং বর্জ্য দূষণের বিষয় উঠে এসেছে।
পুরাতন গোমতী তাই কুমিল্লার কাছে একটি প্রশ্নও ছুড়ে দেয়—
উন্নয়ন কি নদীকে বাদ দিয়ে সম্ভব?
শহরের সৌন্দর্য, বিনোদন, পরিবেশ, জলাবদ্ধতা নিয়ন্ত্রণ ও ঐতিহ্য সংরক্ষণের পরিকল্পনায় পুরাতন গোমতীকে পুনরুজ্জীবিত করা গেলে এটি কুমিল্লার একটি গুরুত্বপূর্ণ নগর-ঐতিহ্য ও পর্যটন সম্পদে পরিণত হতে পারে।
১৫. গোমতীকে ঘিরে পর্যটনের সম্ভাবনা
গোমতীর দুই পাড়ের প্রাকৃতিক দৃশ্য, নদীর বাঁধ, নৌকা, চর, কৃষিজমি, গ্রামীণ জীবন ও সূর্যাস্ত পর্যটনের সম্ভাবনাময় উপাদান।
মুরাদনগর উপজেলা প্রশাসনের পর্যটন তথ্যেও গোমতী নদীকে পর্যটন স্পট হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে এবং নদীর দুই তীরের যোগাযোগ ও অবকাঠামো উন্নত হলে পর্যটনের সম্ভাবনার কথা বলা হয়েছে।
পরিকল্পিতভাবে—
নদীতীর হাঁটার পথ,
বৃক্ষরোপণ,
নৌভ্রমণ,
নদীভিত্তিক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান
স্থানীয় খাদ্য ও হস্তশিল্পের বাজার,
পাখি ও জীববৈচিত্র্য পর্যবেক্ষণ,
নদী জাদুঘর বা নদী ঐতিহ্যকেন্দ্র,
নদী গবেষণা ও শিক্ষা কেন্দ্র,
গড়ে তোলা গেলে গোমতী কুমিল্লার অর্থনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে।
১৬. গোমতী রক্ষায় করণীয়
গোমতীকে বাঁচাতে শুধু খনন করলেই হবে না। প্রয়োজন সমন্বিত নদী ব্যবস্থাপনা।
প্রথমত—নদীর সীমানা রক্ষা,
নদীর প্রকৃত সীমানা নির্ধারণ করে অবৈধ দখল বন্ধ করতে হবে।
দ্বিতীয়ত—বৈজ্ঞানিক ড্রেজিং
প্রয়োজন অনুযায়ী নদীর নাব্যতা ফিরিয়ে আনতে পরিবেশসম্মত ও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে খনন করতে হবে।
তৃতীয়ত—দূষণ বন্ধ
শহরের বর্জ্য, প্লাস্টিক, পলিথিন ও অপরিশোধিত বর্জ্য নদীতে ফেলা বন্ধ করতে হবে।
চতুর্থত—বাঁধের নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ।
বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধকে শুধু বর্ষার আগে নয়, সারা বছর নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করতে হবে।
পঞ্চমত—চর ও নদীতীরের পরিবেশ রক্ষা
অপরিকল্পিত মাটি ও বালু উত্তোলন বন্ধ করতে হবে।
ষষ্ঠত—নদীকেন্দ্রিক কৃষি পরিকল্পনা
বন্যা ও খরার ঝুঁকি বিবেচনায় নদী অববাহিকাভিত্তিক কৃষি পরিকল্পনা করতে হবে।
সপ্তমত—স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ
নদী রক্ষার পরিকল্পনায় কৃষক, জেলে, নৌযান শ্রমিক, নদীতীরবর্তী বাসিন্দা, পরিবেশকর্মী, স্থানীয় সরকার ও প্রশাসনকে যুক্ত করতে হবে।
অষ্টমত—নদীর ইতিহাস সংরক্ষণ
গোমতীর ইতিহাস, পুরনো ঘাট, নৌযান, লোকগান, নদীকেন্দ্রিক পেশা ও লোকস্মৃতি সংগ্রহ করে সংরক্ষণ করা প্রয়োজন।
১৭. ভবিষ্যতের গোমতী—নদীকে ঘিরে নতুন কুমিল্লা।
কুমিল্লার ভবিষ্যৎ উন্নয়নের একটি বড় অংশ হতে পারে গোমতীকেন্দ্রিক পরিকল্পিত উন্নয়ন।
একটি নদীকে কেন্দ্র করে একই সঙ্গে কৃষি, মৎস্য, পর্যটন, পরিবেশ, সংস্কৃতি ও স্থানীয় অর্থনীতিকে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব।
‘নদী বাঁচবে—কৃষি বাঁচবে; কৃষি বাঁচবে—মানুষ বাঁচবে; মানুষ বাঁচবে—সংস্কৃতি বাঁচবে।’
এই দর্শনে গোমতীর পুনরুদ্ধার করতে পারলে কুমিল্লা একটি আধুনিক নদীবান্ধব জনপদের উদাহরণ হতে পারে।
গোমতী কুমিল্লার কাছে শুধু একটি নদীর নাম নয়। এটি কুমিল্লার মানুষের জীবন, জীবিকা, ইতিহাস, অর্থনীতি, কৃষি, মাছ, যোগাযোগ, সংস্কৃতি, স্মৃতি ও আবেগের নাম।
কখনো গোমতীর পানি কৃষকের মাঠে প্রাণ দিয়েছে, কখনো তার মাছ জেলের সংসার চালিয়েছে, কখনো নৌকা বয়ে নিয়েছে মানুষের পণ্য ও স্বপ্ন; কখনো নদীর ঘাটে বসেছে হাট, কখনো নদীর পাড় হয়েছে মানুষের মিলনস্থল; আবার কখনো পাহাড়ি ঢল ও বন্যা মানুষের ঘরে নিয়ে এসেছে দুর্ভোগ।
 গোমতীকে কেবল পানি উন্নয়ন বা বন্যা নিয়ন্ত্রণের বিষয় হিসেবে দেখলে চলবে না। এটিকে দেখতে হবে সমন্বিত নদী-সভ্যতা, জনজীবন ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে।
গোমতীর অতীত কুমিল্লার ইতিহাসের অংশ, বর্তমান কুমিল্লার জীবনযাত্রার অংশ এবং ভবিষ্যৎ কুমিল্লার উন্নয়নেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্ভাবনা।
গোমতী বাঁচলে কুমিল্লার নদী-সভ্যতার স্মৃতি বাঁচবে; গোমতী সুস্থ হলে কৃষি, মৎস্য, জীববৈচিত্র্য, সংস্কৃতি ও মানুষের জীবন আরও সমৃদ্ধ হওয়ার সুযোগ পাবে।
সুতরাং গোমতী রক্ষা শুধু একটি নদী রক্ষার কর্মসূচি নয়—এটি কুমিল্লার ইতিহাস, ঐতিহ্য, অর্থনীতি, পরিবেশ ও মানুষের জীবনধারা রক্ষার অঙ্গীকার।
 গোমতীর দৈর্ঘ্য নিয়ে বিভিন্ন সরকারি/প্রচলিত উৎসে ৯৫ কিমি, ১৩০.১২২ কিমি এবং প্রায় ১৩৫ কিমি—তিন ধরনের সংখ্যা পাওয়া যায়।
গোমতী নদী: উৎপত্তি, ক্রমবিকাশ, প্রবাহপথ, দৈর্ঘ্য, প্রস্থ ও বর্তমান অবস্থা
 কুমিল্লার ইতিহাস, কৃষি, জনজীবন, অর্থনীতি, সংস্কৃতি ও প্রকৃতির সঙ্গে যে নদীর সম্পর্ক সবচেয়ে গভীর, তার নাম গোমতী। এটি শুধু কুমিল্লার একটি নদী নয়—ভারতের ত্রিপুরা ও বাংলাদেশের কুমিল্লাকে সংযুক্ত করা একটি গুরুত্বপূর্ণ আন্তঃসীমান্ত নদী। পাহাড়ি উৎস থেকে জন্ম নিয়ে আঁকাবাঁকা পথে সমতলে নেমে এসে কুমিল্লার বিস্তীর্ণ জনপদ অতিক্রম করে শেষ পর্যন্ত মেঘনা নদীতে মিলিত হয়েছে গোমতী।
কুমিল্লার মানুষের কাছে গোমতী একদিকে আশীর্বাদ, অন্যদিকে ইতিহাসের বিভিন্ন সময়ে বন্যা ও নদীভাঙনের কারণে দুর্ভোগেরও কারণ হয়েছে। নদীটির প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ, শহররক্ষা বাঁধ নির্মাণ, নদীর গতিপথের পরিবর্তন, পুরাতন গোমতীর সৃষ্টি, নাব্যতা হ্রাস, দখল ও দূষণ—সব মিলিয়ে গোমতীর ইতিহাস বাংলাদেশের নদী ব্যবস্থাপনার একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
 গোমতী নদীর ক্রমবিকাশ
গোমতী নদীর উৎপত্তি ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের উত্তর-পূর্ব পার্বত্য অঞ্চলে। বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, নদীটি ত্রিপুরার ডুমুর নামক পার্বত্য এলাকায় উৎপন্ন হয়ে পাহাড়ি ভূমির মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। বিভিন্ন সূত্রে উৎস অঞ্চলকে ডুম্বুর হ্রদ/ডুমুর এলাকা, অমরপুর–উদয়পুর–সোনামুড়ি অঞ্চলের পাহাড়ি জলধারা হিসেবেও বর্ণনা করা হয়েছে।
ডুম্বুর এলাকার পাহাড়ি জলধারা ও বৃষ্টিনির্ভর প্রবাহ মিলেই গোমতীর প্রাথমিক জলপ্রবাহ সৃষ্টি হয়। ত্রিপুরার পাহাড়ি অঞ্চলে নদীটি দীর্ঘ পথ অতিক্রম করে ক্রমে সমতলের দিকে নেমে আসে এবং সোনামুড়া অঞ্চলের দিকে বাংলাদেশের সীমান্তের নিকটবর্তী হয়।
পাহাড়ি উৎসের কারণে গোমতী মূলত একটি বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলনির্ভর নদী। বর্ষায় এর পানিপ্রবাহ দ্রুত বৃদ্ধি পেতে পারে; আবার শুষ্ক মৌসুমে প্রবাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়।
২. ত্রিপুরা থেকে কুমিল্লায় প্রবেশ
গোমতী ত্রিপুরার পাহাড়ি অঞ্চল থেকে পশ্চিম ও উত্তর-পশ্চিমমুখী হয়ে প্রবাহিত হয়ে বাংলাদেশ সীমান্তে পৌঁছায়। কুমিল্লার আদর্শ সদর উপজেলার কটকবাজার/বিবিরবাজার এলাকার নিকট দিয়ে নদীটি বাংলাদেশে প্রবেশ করে বলে সরকারি ও স্থানীয় সরকারি সূত্রে উল্লেখ আছে।
বাংলাদেশে প্রবেশের পর নদীটি সর্পিল বা আঁকাবাঁকা পথে এগিয়ে যায়। কুমিল্লা শহরের উত্তর প্রান্ত এবং ময়নামতির পূর্বাঞ্চল অতিক্রম করে নদীটি ক্রমে উত্তর-পশ্চিম দিকে প্রবাহিত হয়।
৩. কুমিল্লার কোন কোন উপজেলা দিয়ে গোমতী প্রবাহিত?
সরকারি কুমিল্লা জেলা পোর্টালে গোমতীর প্রবাহপথ হিসেবে কুমিল্লা সদর, বুড়িচং, ব্রাহ্মণপাড়া, দেবিদ্বার, মুরাদনগর ও দাউদকান্দি উল্লেখ করা হয়েছে।
অন্যদিকে সাম্প্রতিক স্থানীয় প্রতিবেদনে তিতাস উপজেলাকেও গোমতীর নিম্নপ্রবাহের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে।
তাই বিস্তৃতভাবে গোমতীর কুমিল্লা অংশের প্রবাহপথকে এভাবে উপস্থাপন করা যায়:
আদর্শ সদর → বুড়িচং → ব্রাহ্মণপাড়া/দেবিদ্বার অঞ্চল → মুরাদনগর → তিতাস–দাউদকান্দি নিম্নাঞ্চল → মেঘনা।
তবে উপজেলা সীমানা ও নদীর গতিপথের পরিবর্তনের কারণে কোনো কোনো সরকারি তালিকায় উপজেলার সংখ্যা বা নামের সামান্য পার্থক্য দেখা যায়। গবেষণামূলক লেখায় তাই “প্রধান প্রবাহপথ” হিসেবে এই তালিকা ব্যবহার করাই নিরাপদ।
৪. গোমতীর দৈর্ঘ্য কত?
গোমতী নদীর দৈর্ঘ্য নিয়ে বিভিন্ন সরকারি ও প্রাতিষ্ঠানিক সূত্রে পার্থক্য রয়েছে—এটি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের একটি পরিচিতি অনুযায়ী
বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের আন্তঃসীমান্ত নদী বিষয়ক তথ্যে গোমতীর বাংলাদেশ অংশের দৈর্ঘ্য ৯৫ কিলোমিটার এবং গড় প্রস্থ ৬৫ মিটার উল্লেখ করা হয়েছে। একই সূত্রে নদীটির প্রকৃতি সর্পিলাকার বলা হয়েছে।
কুমিল্লা জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী
কুমিল্লা জেলা সরকারি ওয়েবসাইটে গোমতীর দৈর্ঘ্য ১৩০.১২২ কিলোমিটার উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে কুমিল্লার সদর, বুড়িচং, ব্রাহ্মণপাড়া, দেবিদ্বার ও মুরাদনগর হয়ে দাউদকান্দি দিয়ে মেঘনায় মিলিত হওয়ার কথা বলা হয়েছে।
অন্যান্য গবেষণা/প্রতিবেদন
কিছু স্থানীয় গবেষণা ও প্রতিবেদনে বাংলাদেশের ভূখণ্ডে গোমতীর দৈর্ঘ্য প্রায় ১৩৫ কিলোমিটার বলা হয়েছে।
তাহলে কোন সংখ্যাটি গ্রহণযোগ্য?
এখানে মূল বিষয় হলো “বাংলাদেশ অংশের নদীপথের দৈর্ঘ্য” কীভাবে মাপা হয়েছে। নদীর মূল প্রবাহ, প্রশাসনিক সীমা, পুরাতন প্রবাহপথ এবং মাপজোকের পদ্ধতির পার্থক্যের কারণে সংখ্যায় ভিন্নতা হতে পারে।
সুতরাং গবেষণামূলক লেখায় সবচেয়ে নিরাপদ বক্তব্য হলো:
“গোমতীর বাংলাদেশ অংশের দৈর্ঘ্য বিভিন্ন সরকারি ও প্রাতিষ্ঠানিক উৎসে প্রায় ৯৫ থেকে ১৩৫ কিলোমিটারের মধ্যে উল্লেখ করা হয়েছে; বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের একটি নদী-পরিচিতি সূত্রে ৯৫ কিলোমিটার এবং কুমিল্লা জেলা প্রশাসনের তথ্যপৃষ্ঠায় ১৩০.১২২ কিলোমিটার উল্লেখ রয়েছে।”
এভাবে তথ্যের পার্থক্যটি স্বচ্ছ থাকে।
৫. গোমতী নদীর প্রস্থ
বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের আন্তঃসীমান্ত নদী সংক্রান্ত তথ্যে গোমতীর গড় প্রস্থ ৬৫ মিটার বলা হয়েছে।
তবে নদীর প্রস্থ সর্বত্র সমান নয়। নদীর বাঁক, চর, পলি জমা, মৌসুম, তীর সংরক্ষণব্যবস্থা ও স্থানীয় ভূপ্রকৃতির কারণে কোথাও নদী সরু, আবার কোথাও তুলনামূলক প্রশস্ত।
কিছু স্থানীয় প্রতিবেদনে বর্ষাকালে গোমতীর গড় প্রশস্ততা প্রায় ১০০ মিটার পর্যন্ত উল্লেখ করা হয়েছে।
অতএব—
সরকারি গড় প্রস্থ: প্রায় ৬৫ মিটার।
বর্ষাকালে কোনো কোনো অংশে প্রস্থ: প্রায় ১০০ মিটার বা তার বেশি হতে পারে।
এ দুটিকে একই ধরনের পরিমাপ হিসেবে ব্যবহার করা উচিত নয়।
৬. গোমতীর প্রবাহ ও পানি ওঠানামা
গোমতী একটি খরস্রোতা পাহাড়ি নদী। বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী কুমিল্লা অঞ্চলে এর প্রবাহমাত্রা প্রায় ১০০ থেকে ২০,০০০ কিউসেক পর্যন্ত ওঠানামা করতে পারে।
এ বিশাল পার্থক্য থেকে বোঝা যায় যে গোমতীর জলপ্রবাহ অত্যন্ত পরিবর্তনশীল।
বর্ষায়—
ত্রিপুরার পাহাড়ি ঢল নামে;
অতিবৃষ্টিতে পানির পরিমাণ দ্রুত বাড়ে;
নদীর স্রোত তীব্র হয়;
নিম্নাঞ্চলে প্লাবনের ঝুঁকি বাড়ে।
অন্যদিকে শুষ্ক মৌসুমে—
উজান থেকে পানির প্রবাহ কমে;
নদীর বিভিন্ন অংশে চর জেগে ওঠে;
নৌচলাচল ব্যাহত হয়;
সেচ ও মৎস্যসম্পদের ওপর প্রভাব পড়ে।
২০২৪ সালের আগস্টের ভয়াবহ বন্যার সময় গোমতীর পানি বিপৎসীমার ১১৭ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছিল বলে সমসাময়িক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
এটি গোমতীর আকস্মিক প্রবাহ বৃদ্ধির সক্ষমতার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ।
৭. গোমতীর উত্থান-পতন: কেন এত দ্রুত পরিবর্তন হয়?
গোমতীর পানির ওঠানামার প্রধান কারণগুলো হলো—
ক. পাহাড়ি ঢল
ত্রিপুরার পাহাড়ি এলাকায় ভারী বৃষ্টি হলে অল্প সময়ে বিপুল পানি নদীতে নেমে আসে।
খ. মৌসুমি বৃষ্টিপাত
বর্ষাকালে বাংলাদেশ ও ভারতের উজানে ব্যাপক বৃষ্টিপাত নদীর প্রবাহ বাড়ায়।
গ. শুষ্ক মৌসুম
বৃষ্টিপাত কমে গেলে এবং উজানের প্রবাহ কমলে গোমতীর পানির স্তর দ্রুত নেমে যায়।
ঘ. নদীর পলি জমা
তলদেশে পলি জমলে নদীর ধারণক্ষমতা কমে যায় এবং একই পরিমাণ পানি প্রবাহিত হলেও পানি দ্রুত তীরের কাছাকাছি উঠে যেতে পারে।
ঙ. নদীর গতিপথ পরিবর্তন
কুমিল্লা শহর রক্ষার জন্য বিগত শতাব্দীর ষাটের দশকে বাঁধ নির্মাণের ফলে গোমতীর শহরসংলগ্ন অংশের প্রবাহপথ পরিবর্তিত হয়। এর ফলে পুরাতন গোমতী নামে একটি পৃথক জলধারা/পুরোনো নদীখাতের অস্তিত্ব তৈরি হয়।
৮. কুমিল্লার বন্যা ও গোমতী
ঐতিহাসিকভাবে গোমতীর অতিরিক্ত পানি কুমিল্লা শহর ও আশপাশের নিম্নাঞ্চলে বন্যার কারণ হয়েছে। এ কারণেই একসময় গোমতীকে কুমিল্লার “দুঃখ” বলা হতো।
বর্ষায় নদীর পানি বেড়ে গেলে শহর ও জনপদ প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হতো। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় ষাটের দশকে কুমিল্লা শহর রক্ষায় বাঁধ নির্মাণ করা হয় এবং নদীর প্রবাহপথ পরিবর্তিত হয়।
কুমিল্লা জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী গোমতীর ডান তীরে প্রায় ৪১ কিলোমিটার এবং বাম তীরে প্রায় ৩৪.৭৫ কিলোমিটার বন্যা ব্যবস্থাপনা বাঁধ রয়েছে।
অর্থাৎ দুই তীরে উল্লেখিত বাঁধের মোট দৈর্ঘ্য প্রায় ৭৫.৭৫ কিলোমিটার।
৯. পুরাতন গোমতীর সৃষ্টি
গোমতীর ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনগুলোর একটি হলো কুমিল্লা শহরের পাশ দিয়ে প্রবাহিত পুরাতন নদীখাতের সৃষ্টি।
ষাটের দশকে শহরকে বন্যার ঝুঁকি থেকে রক্ষার জন্য বাঁধ ও নদী ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে মূল প্রবাহপথ পরিবর্তিত হয়। এর ফলে কুমিল্লা শহরের কাপ্তানবাজার থেকে চানপুর–শুভপুর পর্যন্ত প্রায় ৬ কিলোমিটার অংশ পুরাতন বা মরা গোমতী নামে পরিচিত হয়।
এই পুরাতন গোমতী একসময় শহরের জীবন, সংস্কৃতি ও যোগাযোগের অংশ ছিল। বর্তমানে এর বড় অংশ দখল, বর্জ্য, পলি ও স্থাপনার চাপে সংকুচিত হয়েছে।
১০. কৃষিতে গোমতীর অবদান
গোমতী কুমিল্লার কৃষির সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত।
নদীর পানি ও আশপাশের জলাভূমি—
সেচের পানি সরবরাহ করে;
বোরো ধানের উৎপাদনে সহায়তা করে;
শাকসবজি ও অন্যান্য ফসল উৎপাদনে ভূমিকা রাখে;
নদীতীরের উর্বর পলিমাটি কৃষির জন্য উপযোগী করে;
বর্ষাকালে জলাবদ্ধতা ও অতিরিক্ত পানি নিষ্কাশনের পথ হিসেবে কাজ করে।
অর্থাৎ গোমতী শুধু একটি জলপ্রবাহ নয়; এটি কুমিল্লার খাদ্যনিরাপত্তা ও কৃষি অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক অবকাঠামো।
১১. মৎস্য ও জীববৈচিত্র্য
গোমতী নদী ঐতিহাসিকভাবে মাছের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রজনন ও বিচরণক্ষেত্র ছিল। নদী, খাল, বিল ও প্লাবনভূমির আন্তঃসংযোগের মাধ্যমে মাছ ও অন্যান্য জলজ প্রাণী এক জলাশয় থেকে অন্য জলাশয়ে চলাচল করতে পারত।
নদীর পানি কমে যাওয়া, পলি জমা, দূষণ, অবৈধ মাছ ধরা, নদীর সঙ্গে সংযুক্ত খাল বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং জলাভূমি ভরাটের কারণে এই প্রাকৃতিক ব্যবস্থা দুর্বল হয়েছে।
ফলে গোমতী পুনরুদ্ধার মানে শুধু নদীতে পানি ফিরিয়ে আনা নয়; এর সঙ্গে যুক্ত মাছ, জলজ উদ্ভিদ, পাখি, সরীসৃপ ও অন্যান্য জীববৈচিত্র্যের আবাসস্থল পুনরুদ্ধার করাও জরুরি।
১২. গোমতীর নৌপথ ও অর্থনীতি
একসময় গোমতী ছিল স্থানীয় নৌ-যোগাযোগ ও পণ্য পরিবহনের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। নদীর তীরে বাজার, হাট ও জনবসতি গড়ে ওঠে। স্থানীয় ইতিহাস ও সংবাদ প্রতিবেদনে গোমতীকে কেন্দ্র করে পুরোনো বাজার ও বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ডের উল্লেখ পাওয়া যায়।
কিন্তু নাব্যতা কমে যাওয়ার ফলে বড় নৌযান চলাচল অনেকাংশে কমেছে। শুষ্ক মৌসুমে কোথাও কোথাও নদীর তলদেশে চর জেগে ওঠে এবং মানুষ হেঁটে নদী পার হওয়ার মতো পরিস্থিতিও তৈরি হয় বলে সংবাদ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
১৩. গোমতীর বর্তমান সংকট
গোমতীর বর্তমান সংকট কয়েকটি স্তরে বিভক্ত।
১. নাব্যতা হ্রাস
পলি জমে নদীর তলদেশ উঁচু হওয়ায় অনেক অংশে পানির ধারণক্ষমতা কমেছে।
২. নদী দখল
নদীর তীর ও নদীসীমার জায়গা দখল করে বাড়িঘর, দোকান ও বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণের অভিযোগ রয়েছে।
৩. মাটি ও বালু উত্তোলন
কিছু এলাকায় নদী ও তীর থেকে মাটি-বালু উত্তোলনের ফলে নদীর স্বাভাবিক আকৃতি ও তীরের স্থিতিশীলতা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কথা প্রতিবেদনে এসেছে।
৪. দূষণ
বিশেষ করে পুরাতন গোমতীতে গৃহস্থালি বর্জ্য, প্লাস্টিক, পলিথিন ও নোংরা পানি নদীর পরিবেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
৫. প্রবাহ বিচ্ছিন্নতা
নদীর সঙ্গে সংযুক্ত ছোট নদী, খাল ও জলাভূমি বন্ধ বা ভরাট হলে স্বাভাবিক জলপ্রবাহ ব্যাহত হয়।
৬. নদীতীরের বৃক্ষনিধন
নদীর বাঁধ ও তীরের গাছপালা কেটে ফেলার ফলে মাটি ক্ষয় ও পরিবেশগত ভারসাম্য ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
১৪. গোমতীর বর্তমান অবস্থা—একটি বৈপরীত্য
গোমতীর বর্তমান অবস্থা এক ধরনের বৈপরীত্য তুলে ধরে।
বর্ষায় উজানের পাহাড়ি ঢল ও অতিবৃষ্টিতে নদী ভয়ংকরভাবে ফুলে উঠতে পারে। আবার শুষ্ক মৌসুমে একই নদীর অনেক অংশে পানি অস্বাভাবিকভাবে কমে গিয়ে চর জেগে ওঠে।
অর্থাৎ সমস্যাটি শুধু “নদীতে পানি নেই” নয় এবং শুধু “বন্যা হয়”—এ দুটির কোনোটিই এককভাবে গোমতীর সমস্যা ব্যাখ্যা করে না।
মূল সমস্যা হলো:
অতিরিক্ত পানি ও স্বল্প পানির মধ্যে ভারসাম্যহীনতা + নাব্যতা হ্রাস + নদী দখল + দূষণ + নদী-খাল সংযোগ বিচ্ছিন্নতা।
১৫. গোমতী পুনরুদ্ধারে করণীয়
গোমতীকে বাঁচাতে একটি সমন্বিত নদী ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা প্রয়োজন।
প্রথমত: নদীর সীমানা নির্ধারণ
পুরো নদীর সিএস, এসএ, আরএস, বিএস ও বর্তমান দখল পরিস্থিতির সমন্বিত ডিজিটাল মানচিত্র তৈরি করতে হবে।
দ্বিতীয়ত: অবৈধ দখলমুক্তকরণ
নদীর প্রবাহপথ ও সরকারি নদীভূমি দখল করে গড়ে ওঠা অবৈধ স্থাপনা পর্যায়ক্রমে উচ্ছেদ করতে হবে।
তৃতীয়ত: বৈজ্ঞানিক পুনঃখনন
শুধু মাটি তুলে অন্যত্র ফেলা নয়—নদীর হাইড্রোলজি, পলি পরিবহন ও প্রবাহের গতি বিবেচনা করে বৈজ্ঞানিক ড্রেজিং করতে হবে।
চতুর্থত: খাল পুনরুদ্ধার
গোমতীর সঙ্গে সংযুক্ত পুরোনো খাল, বিল ও জলাধার পুনরুদ্ধার করতে হবে। শুধু মূল নদী খনন করলে পূর্ণাঙ্গ জলপ্রবাহ ব্যবস্থা ফিরবে না।
পঞ্চমত: দূষণ নিয়ন্ত্রণ
কোনো অবস্থাতেই অপরিশোধিত পয়ঃবর্জ্য, শিল্পবর্জ্য, প্লাস্টিক বা পলিথিন নদীতে ফেলা যাবে না।
ষষ্ঠত: নদীতীরের সবুজ বেষ্টনী
উপযোগী দেশীয় বৃক্ষ দিয়ে নদীতীর ও বাঁধের পরিবেশবান্ধব সবুজ বেষ্টনী তৈরি করা যেতে পারে।
সপ্তমত: মৎস্য অভয়াশ্রম
নির্বাচিত স্থানে মাছের প্রজনন ও বিচরণক্ষেত্র সংরক্ষণ করতে হবে।
অষ্টমত: আন্তঃসীমান্ত সহযোগিতা
গোমতী যেহেতু ভারত–বাংলাদেশের আন্তঃসীমান্ত নদী, তাই উজান ও ভাটির পানি ব্যবস্থাপনা, বন্যার পূর্বাভাস, তথ্য বিনিময় এবং নদীর পরিবেশ সংরক্ষণে দুই দেশের সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ।
নবমত: নদীকেন্দ্রিক কৃষি পরিকল্পনা
গোমতীর পানি, বন্যা ও পলি ব্যবস্থাকে বিবেচনায় রেখে নিরাপদ ও পরিবেশবান্ধব কৃষি পরিকল্পনা করা যেতে পারে।
১৬. গোমতীকে শুধু নদী নয়, একটি জীবন্ত প্রতিবেশব্যবস্থা হিসেবে দেখতে হবে
গোমতীকে শুধু পানি বহনকারী একটি খাত হিসেবে দেখলে নদী রক্ষা সম্ভব নয়।
একটি নদীর সঙ্গে যুক্ত থাকে—
উৎস → পাহাড় → উপনদী → মূল নদী → খাল → বিল → প্লাবনভূমি → কৃষিজমি → মাছ → পাখি → মানুষ → অর্থনীতি।
এই পুরো ব্যবস্থাকে একসঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।
গোমতীর ক্ষেত্রে তাই “নদী পুনরুদ্ধার” মানে শুধু খনন নয়; বরং নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ, তীর, জলাভূমি, জীববৈচিত্র্য, কৃষি ও মানুষের জীবন-জীবিকার সমন্বিত পুনরুদ্ধার।
১৭. গোমতী নদী: গুরুত্বপূর্ণ তথ্য এক নজরে
বিষয়
তথ্য
নদীর নাম
গোমতী
ধরন
আন্তঃসীমান্ত নদী
সংশ্লিষ্ট দেশ
ভারত ও বাংলাদেশ
উৎস
ভারতের ত্রিপুরার উত্তর-পূর্ব পার্বত্য অঞ্চল; ডুমুর/ডুম্বুর এলাকা
বাংলাদেশে প্রবেশ
কুমিল্লার আদর্শ সদর উপজেলার কটকবাজার/বিবিরবাজার এলাকা
পতনমুখ
মেঘনা নদী
প্রধান জেলা
কুমিল্লা
বাংলাদেশ অংশের দৈর্ঘ্য
BWDB-এর একটি সূত্রে ৯৫ কিমি
কুমিল্লা জেলা পোর্টালের দৈর্ঘ্য
১৩০.১২২ কিমি
অন্যান্য প্রচলিত মাপ
প্রায় ১৩৫ কিমি
সরকারি গড় প্রস্থ
প্রায় ৬৫ মিটার
বর্ষায় কোনো কোনো অংশে
প্রায় ১০০ মিটার বা তার বেশি
প্রকৃতি
সর্পিলাকার, পাহাড়ি ও বৃষ্টিনির্ভর
প্রবাহমাত্রা
প্রায় ১০০–২০,০০০ কিউসেক পর্যন্ত ওঠানামার তথ্য রয়েছে
প্রধান প্রবাহপথ
আদর্শ সদর, বুড়িচং, ব্রাহ্মণপাড়া/দেবিদ্বার অঞ্চল, মুরাদনগর, তিতাস–দাউদকান্দি নিম্নাঞ্চল
শহররক্ষা বাঁধ
ডান তীরে ৪১ কিমি, বাম তীরে ৩৪.৭৫ কিমি—কুমিল্লা জেলা পোর্টাল অনুযায়ী
প্রধান সমস্যা
নাব্যতা হ্রাস, পলি, দখল, দূষণ, মাটি-বালু উত্তোলন, প্রবাহ বিচ্ছিন্নতা
ঐতিহাসিক গুরুত্ব
কুমিল্লার কৃষি, জনবসতি, বাণিজ্য, সংস্কৃতি ও পরিবেশের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত
উপরের দৈর্ঘ্যসংক্রান্ত ভিন্নতা বিভিন্ন সরকারি/প্রাতিষ্ঠানিক মাপের পার্থক্যকে প্রতিফলিত করে; তাই গবেষণামূলক লেখায় একটি সংখ্যাকে একমাত্র চূড়ান্ত সংখ্যা হিসেবে না দেখানোই অধিক নির্ভরযোগ্য।
উপসংহার
গোমতী কুমিল্লার শুধু একটি নদী নয়—এটি কুমিল্লার প্রকৃতি, কৃষি, পানি, জীববৈচিত্র্য, ইতিহাস, অর্থনীতি ও মানুষের জীবনধারার সঙ্গে যুক্ত একটি জীবন্ত নদী-সভ্যতা।
ত্রিপুরার পাহাড়ি অঞ্চল থেকে উৎপন্ন হয়ে কুমিল্লার বুক চিরে মেঘনায় পতিত হওয়ার দীর্ঘ যাত্রাপথে গোমতী বহু জনপদকে জীবন দিয়েছে। আবার তার প্রবল বর্ষাকালীন স্রোত বহুবার বন্যার কারণ হয়েছে। মানুষের প্রয়োজন অনুযায়ী বাঁধ নির্মাণ ও নদীর গতিপথ পরিবর্তনের ফলে একদিকে শহররক্ষা সম্ভব হয়েছে, অন্যদিকে পুরাতন গোমতীর মতো নদীখাতের স্বাভাবিক প্রবাহ হারিয়েছে।
আজকের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন হলো গোমতীকে দখলমুক্ত, দূষণমুক্ত, প্রবাহমান ও জীববৈচিত্র্যসমৃদ্ধ নদী হিসেবে পুনরুদ্ধার করা।
শুধু নদী খনন নয়—প্রয়োজন উৎস থেকে মোহনা পর্যন্ত সমন্বিত ব্যবস্থাপনা। প্রয়োজন নদী ও তার সঙ্গে যুক্ত খাল-বিল-জলাভূমির পুনঃসংযোগ। প্রয়োজন কৃষক, জেলে, নদীতীরবর্তী মানুষ, স্থানীয় সরকার, পানি উন্নয়ন বোর্ড, প্রশাসন, পরিবেশ সংগঠন এবং দুই দেশের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সমন্বিত উদ্যোগ।
গোমতী বাঁচলে কুমিল্লার পানি, কৃষি, প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্য বাঁচবে; আর গোমতীকে সুস্থ নদী হিসেবে ফিরিয়ে দিতে পারলে কুমিল্লার ভবিষ্যৎ আরও পরিবেশবান্ধব, সমৃদ্ধ, টেকসই ও নিরাপদ হতে পারে।
★তথ্যসূত্রের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা: গোমতীর দৈর্ঘ্য নিয়ে ৯৫, ১৩০.১২২ ও প্রায় ১৩৫ কিমি—এই তিনটি সংখ্যা পাওয়া যায়। তাই আপনার বইয়ে “বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নদী-পরিচিতি অনুযায়ী ৯৫ কিমি” এবং “কুমিল্লা জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী ১৩০.১২২ কিমি”—দুটিই উল্লেখ করা ভালো।
সাহিত্যে গোমতী নদী—নজরুল থেকে সমকাল
গোমতী শুধু একটি নদীর নাম নয়।এটি কুমিল্লার ইতিহাস, জনজীবন, প্রেম, প্রকৃতি, কৃষি, সংস্কৃতি ও স্মৃতির সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত একটি জীবন্ত সত্তা। ত্রিপুরার পাহাড়ি অঞ্চল থেকে প্রবাহিত হয়ে কুমিল্লার জনপদ অতিক্রম করা এই নদী বহু শতাব্দী ধরে মানুষের জীবন ও জীবিকার সহযাত্রী। ফলে স্বাভাবিকভাবেই গোমতী স্থান করে নিয়েছে কবিতা, গান, উপন্যাস, স্মৃতিকথা ও স্থানীয় লোকসাহিত্যে।
নজরুলের সাহিত্য ও গোমতী
গোমতীকে বাংলা সাহিত্যে বিশেষ আবেগময় মর্যাদা দেওয়ার ক্ষেত্রে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের কুমিল্লা-পর্ব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ১৯২১–২৩ সময়কালে নজরুল কুমিল্লায় অবস্থান করেন। এই সময় কুমিল্লার প্রকৃতি, নদী, পল্লিজীবন, প্রেম ও বিরহ তাঁর সৃষ্টিশীল অনুভূতিকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে।
নজরুলের ছায়ানট কাব্যগ্রন্থের ‘চৈতী হাওয়া’ কবিতায় গোমতীর স্মৃতি অত্যন্ত আবেগঘনভাবে এসেছে। বহুল উদ্ধৃত পঙ্‌ক্তি।
“উদাস দুপুর কখন গেছে, এখন বিকাল যায়,
ঘুম জড়াল গোমতী নদীর ঘুমুর-পরা পায়।”
এই চিত্রকল্পে গোমতী শুধু একটি ভৌগোলিক নদী নয়। এটি হয়ে উঠেছে স্মৃতি, প্রেম, বিরহ ও প্রকৃতির এক সম্মিলিত প্রতীক। নজরুলের কুমিল্লা-জীবন নিয়ে প্রকাশিত বিভিন্ন গবেষণামূলক ও সংবাদভিত্তিক লেখাতেও এই অংশটি উদ্ধৃত হয়েছে।
‘চৈতী হাওয়া’য় প্রকৃতির নানা অনুষঙ্গের সঙ্গে ব্যক্তিগত প্রেম ও বিচ্ছেদের স্মৃতি মিশে গেছে। ফলে গোমতীর জল, তীর ও পরিবেশ কবির অন্তর্জগতের আবহ নির্মাণে ভূমিকা নিয়েছে।
গোমতীর তীরে নজরুলের স্মৃতি
কুমিল্লায় অবস্থানকালে নজরুলের জীবন ও সৃষ্টির সঙ্গে শহরের বিভিন্ন স্থান ও প্রাকৃতিক পরিবেশের সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল। কুমিল্লার বিভিন্ন ঐতিহাসিক বিবরণে গোমতী নদীর তীরের স্মৃতিও তাঁর সাহিত্যিক অনুভূতির সঙ্গে যুক্ত হয়েছে।
নজরুলের একটি গানের পঙ্‌ক্তি হিসেবেও উদ্ধৃত হয়েছে—
“আজো মধুর বাঁশরী বাজে,
গোমতীর তীরে পাতার কুটিরে,
আজো সে পথ চাহে সাঁঝে।”
গোমতীর তীর এখানে অপেক্ষা, স্মৃতি ও প্রেমের এক প্রতীকী ভূদৃশ্য হয়ে উঠেছে।
এ কারণে কুমিল্লার সাহিত্য-ইতিহাসে গোমতীকে কেবল নদী হিসেবে দেখলে এর সাংস্কৃতিক তাৎপর্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ বাদ পড়ে যায়।
‘নজরুল রচনাসম্ভার’-এ গোমতীর উল্লেখ
গোমতীর সঙ্গে নজরুলের সাহিত্যিক সম্পর্কের আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ পাওয়া যায় নজরুল রচনাসম্ভার-এর উদ্ধৃত অংশে। সেখানে কুমিল্লার গোমতী-তীরের স্মৃতি তাঁর একাধিক কবিতায় কীভাবে রূপ পেয়েছে, তার উল্লেখ রয়েছে। বিশেষভাবে ‘চৈতী হাওয়া’ এবং গোমতী-তীরের স্মৃতিকে পাশাপাশি উল্লেখ করা হয়েছে।
‘গোমতী নদীর তীরে’—উপন্যাস
গোমতীকে কেন্দ্র করে সরাসরি সাহিত্যকর্মও রয়েছে। মোজ্জামেল হক আরিন্দা রচিত ‘গোমতি নদীর তীরে’ নামে একটি উপন্যাস ২০১০ সালে কিশোর প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত হয়। বইটির বিবরণে ত্রিপুরা ও গোমতী নদীর সঙ্গে স্থানীয় জনজীবন, জেলে, নৌযান, কৃষি ও নদীর পলিমাটির সম্পর্ক তুলে ধরা হয়েছে।
নদীকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা মানুষের জীবন ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডও সাহিত্যের বিষয় হয়েছে।
‘গোমতী নদীর তীরে’—কাব্যগ্রন্থ
সমকালীন সাহিত্যে কাজী বেলাল রাজী-এর ‘গোমতী নদীর তীরে’ নামে একটি কাব্যগ্রন্থও রয়েছে।  এতে প্রকৃতি, দেশ, ধর্ম, সামাজিক প্রতিবাদ ও মানবিক বিষয় নিয়ে ছড়া-কবিতা রয়েছে।
অর্থাৎ গোমতী নদীকে কেন্দ্র করে সাহিত্যচর্চা শুধু অতীতের বিষয় নয়; সমকালেও নদীটির নাম ও ভূদৃশ্য সাহিত্যিক সৃষ্টির অনুপ্রেরণা হয়ে আছে।
আধুনিক কবিতায় গোমতী
সমকালীন অনলাইন বাংলা কবিতাতেও ‘গোমতী’ নামটি সরাসরি কবিতার বিষয় হয়েছে। যেমন প্রসেনজিৎ রায়ের ‘গোমতী’ কবিতায় নদীকে প্রেম, অপেক্ষা, স্মৃতি ও আবেগের প্রতীকে ব্যবহার করা হয়েছে।
এ ধরনের কবিতায় গোমতী একটি বাস্তব নদীর পাশাপাশি মানুষের ব্যক্তিগত অনুভূতির প্রতীকী নদী হিসেবেও আবির্ভূত হয়।
কুমিল্লা থেকে প্রকাশিত অভিবাদন পত্রিকার সম্পাদক, সাংস্কৃতিক ব্যাক্তিত্ত আবুল হাসনাত বাবুল তাঁর পত্রিকায় ‘গোমতীর পাড় থেকে বলছি’ শিরোনামে নিয়মিত কলাম লেখছেন। বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন বাপা কুমিল্লা আঞ্চলিক কমিটির উদ্যোগে গোমতী নদীর শরীর স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণ করে বিভিন্ন সময়ে সভা-সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়।  পরিবেশবিদ অধ্যক্ষ ডাঃ মোসলেহ উদ্দিন আহমেদ গোমতী সহ বিভিন্ন নদনদী প্রায়ই পত্রিকায় লেখালেখি চালিয়ে যাচ্ছেন।
গোমতী ও লোকজ সংস্কৃতি
সাহিত্য ছাড়াও গোমতীর সঙ্গে কুমিল্লার লোকজ সংস্কৃতির গভীর সম্পর্ক রয়েছে। নদীকে ঘিরে নৌযান, মাছ ধরা, কৃষিকাজ, নদীতীরের হাট-বাজার, বর্ষার জীবন, নৌকার চলাচল, নদীপাড়ের প্রেম-বিরহ ও সামাজিক সম্পর্ক—এসব বিষয় স্থানীয় লোকস্মৃতি ও মৌখিক সাহিত্যে বিভিন্নভাবে প্রতিফলিত হয়েছে।
গোমতী তাই কুমিল্লার মানুষের কাছে একই সঙ্গে—
জীবনের নদী, জীবিকার নদী, স্মৃতির নদী এবং সাহিত্যের নদী।
গোমতী: প্রেম ও বিরহের প্রতীক
নজরুলের কবিতায় গোমতীর যে রূপটি বিশেষভাবে লক্ষণীয় তা হলো—নদীটি কখনো শান্ত, কখনো বিষণ্ণ, কখনো স্মৃতিময়। নদীর স্রোত যেন মানুষের মনের স্রোতের সঙ্গে মিশে যায়।
গোমতীর তীর হয়ে ওঠে—
প্রিয়জনকে স্মরণ করার স্থান,
হারানো দিনের স্মৃতির স্থান,
প্রেম ও বিরহের পটভূমি,
প্রকৃতির সৌন্দর্য অনুভবের স্থান,
এবং মানুষের অন্তর্জগত প্রকাশের একটি শক্তিশালী প্রতীক।
এই কারণেই গোমতীকে কুমিল্লার সাহিত্যিক ভূগোলের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান বলা যায়।
গোমতী ও কৃষিজীবন
গোমতীর সাহিত্যিক পরিচয়ের পাশাপাশি এর বাস্তব জীবনভিত্তিক পরিচয়ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নদীর পানি ও পলিমাটি দীর্ঘদিন ধরে কুমিল্লার কৃষি ও জনজীবনে ভূমিকা রেখেছে। নদীর তীরবর্তী অঞ্চলে ধান, শাকসবজি ও অন্যান্য ফসল উৎপাদন, মাছ ধরা এবং নদীকেন্দ্রিক স্থানীয় অর্থনীতি মানুষের জীবনধারাকে প্রভাবিত করেছে।
ফলে গোমতীকে নিয়ে পূর্ণাঙ্গ সাহিত্য-আলোচনা করতে গেলে নদীর প্রকৃতি, কৃষি, অর্থনীতি ও জনজীবন—এই চারটি বিষয়কেও পাশাপাশি দেখতে হবে।
গোমতী ও কুমিল্লার সাংস্কৃতিক পরিচয়
কুমিল্লার সাংস্কৃতিক পরিচয়ের সঙ্গে গোমতীর সম্পর্ক এতটাই গভীর যে নদীটি শহর ও জনপদের স্মৃতির অংশ হয়ে গেছে। নজরুলের কুমিল্লা-পর্ব এই সম্পর্ককে বাংলা সাহিত্যের বৃহত্তর পরিসরে পরিচিত করেছে।
একদিকে নজরুলের প্রেম-বিরহের কবিতায় গোমতী, অন্যদিকে উপন্যাস ও সমকালীন কাব্যে গোমতী—সব মিলিয়ে নদীটি কুমিল্লার সাহিত্যিক পরিচয়ের একটি স্বতন্ত্র প্রতীক হয়ে উঠেছে।
গোমতী নদীকে শুধু মানচিত্রের একটি নীল রেখা হিসেবে দেখলে তার প্রকৃত পরিচয় ধরা পড়ে না। গোমতী কুমিল্লার মানুষের জীবন, কৃষি, অর্থনীতি, সংস্কৃতি, প্রেম, স্মৃতি ও সাহিত্যের সঙ্গে বহুমাত্রিকভাবে যুক্ত। গোমতী নদী সম্পর্কে আমার কবিতা উল্লেখ করছি।
গোমতীর গৌরব
—- মতিন সৈকত
গোমতী এখন খরায় ডায়াবেটিক রোগীর মত জীর্ণ-শীর্ণ
শরীর ভেঙেচুড়ে মুখমন্ডল মলিন অন্তর বেদনায় বিদীর্ণ
মাটিখেকো দস্যুদের দৌরাত্তে ক্ষতবিক্ষত লণ্ডভণ্ড সব গোমতী কুমিল্লার প্রাণ দেশের অবিচ্ছেদ্য অংশ কলরব
 নদী বাঁচাতে দেশ বাঁচাতে পরিরেশ বাঁচাতে হও যোদ্ধা
সব বিপদেআপদে মা-মাতৃভূমির জন্য হও রণযোদ্ধা
বর্ষায় বন্যায় পাহাড়ি ঢলে উজানের স্রোতে মরণফাঁদ
গোমতী ধারণ ক্ষমতার বাইরে চলে গিয়ে ঘটায় বরবাদ
কতবার যে ভেঙেছে বেড়িবাঁধ বাড়িঘর আশা স্বপসাধ
আতংকে কাঁপে জনপদ জানমালের ছুটে যায় সব বাঁধ
গোমতী বর্ষায় খরায় হোক জানমাল ফসলের  সহায়ক
গোমতীর গৌরব চিরকাল থাকুক কল্যাণের প্রদায়ক’
(লেখক চারবার জাতীয় পদক প্রাপ্ত কৃষি পরিবেশ সমাজ উন্নয়ন সংগঠক। এগ্রিকালচারাল ইম্পর্ট্যান্ট পারসন এআইপি)
Facebook Comments Box
See also  সৌদি আরবে সড়ক দুর্ঘটনায় কুমিল্লার প্রবাসী যুবক নিহত

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

ঠাকুরগাঁও উপজেলায় কৃষক কার্ড কর্মসূচির উদ্বোধন প্রধানমন্ত্রীর

১

বিরামপুরে কৃষক কার্ড ও কৃষি উপকরণ সহায়তা বিতরণ

২

বাঁশ কাটাকে কেন্দ্র করে চাচা-ভাতিজার হামলায় নিহত শফিকুল

৩

স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে কোনো কলঙ্ক বিএনপি নেবে না: শাহে আলম

৪

গুপ্ত দলটি সবসময় জনগণের স্বার্থবিরোধী কাজ করছে: প্রধানমন্ত্রী

৫

রমজানের আগে ২ হাজার ইউপি নির্বাচন করার পরিকল্পনা ইসির

৬

বিএনপি সর্বশক্তি দিয়ে নিশ্চিত করবে আইন সবার জন্য সমান: প্রধানমন্ত্রী

৭

জরুরি সংবাদ সম্মেলন ডেকেছেন স্পিকার

৮

পদত্যাগপত্রে যা লিখেছেন ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি

৯

“সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানি বা অঙ্গহানি কোনো অর্থ দিয়ে পূরণ করা সম্ভব নয়”-মনিরুল হক চৌধুরী এমপি

১০

আগারগাঁওয়ে খেলতে গিয়ে প্রাইভেটকারের ধাক্কায় শিশুর মৃ ত্যু

১১

রাউজানে গো লাগুলিতে ১২ পুলিশ আহত, অস্ত্রসহ স ন্ত্রাসী গ্রেফতার

১২

ফেনীতে ১,৫৪২ কোটি টাকার বন্যা নিয়ন্ত্রণ প্রকল্প উদ্বোধন করলেন প্রধানমন্ত্রী

১৩

সুষ্ঠু নির্বাচনের স্বার্থে প্রয়োজন অনুযায়ী যে কোনো পদক্ষেপ নেবে কমিশন: ইসি সচিব

১৪

দক্ষ জনশক্তি অভিবাসন ও বিনিয়োগে অস্ট্রেলিয়ার সহযোগিতা চান রাষ্ট্রপতি

১৫

স্বামী বাসায় ফিরে দরজা ভেঙে পেলেন স্ত্রীর ম রদেহ

১৬

এমপি মিষ্টির পদত্যাগের পর জামায়াত আমিরের ফেসবুক স্ট্যাটাস

১৭

সুপারিশের পরও বাদ পড়া ৪৬ জনের গেজেট আগামী সোমবার

১৮

বিএনপির পায়ের নিচে আর মাটি নাই: ডাকসু ভিপি

১৯

‘বিএনপি কোনো অপরাধীকে প্রশ্রয় দেয় না, এটি আবারও প্রমাণিত’

২০