জামালপুর প্রতিনিধি
জামালপুর জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের উচ্চমান সহকারী কাম হিসাবরক্ষক আলী আহমেদের বিরুদ্ধে নিয়োগ, পদায়ন ও বদলি বাণিজ্যসহ বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। দীর্ঘদিন ধরে একই কর্মস্থলে দায়িত্ব পালন করার সুবাদে তাঁর বিরুদ্ধে একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট গড়ে তোলা এবং শিক্ষকদের কাছ থেকে বিভিন্ন কাজের বিনিময়ে আর্থিক সুবিধা নেওয়ার অভিযোগ করেছেন কয়েকজন ভুক্তভোগী শিক্ষক। তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন আলী আহমেদ।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, আলী আহমেদ নেত্রকোণা জেলার দুর্গাপুর থেকে বদলি হয়ে ২০১৬ সালের ১৭ জুলাই জামালপুর জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসে যোগদান করেন। এরপর থেকে দীর্ঘ সময় একই কর্মস্থলে দায়িত্ব পালন করছেন তিনি। অভিযোগ রয়েছে, দীর্ঘদিন একই অফিসে থাকার সুবাদে তিনি সেখানে প্রভাব বিস্তার করে একটি সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছেন।
অভিযোগকারীদের দাবি, অতীতে আলী আহমেদ ও তৎকালীন জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোফাজ্জল হোসেন খানকে ঘিরে নিয়োগ, পদায়ন, বদলি বাণিজ্য এবং উৎকোচ গ্রহণের অভিযোগে বিভিন্ন জাতীয় ও স্থানীয় সংবাদপত্রে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছিল। অভিযোগকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, ওই সময় তদন্তের পর জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোফাজ্জল হোসেন খানকে অন্যত্র বদলি করা হলেও আলী আহমেদ একই কর্মস্থলে থেকে যান। এ কারণে তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে কার্যকর তদন্ত ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাঠদানের অনুমতি নিয়েও অভিযোগ আলী আহমেদের বিরুদ্ধে নতুন করে অভিযোগ উঠেছে, জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার নাম ব্যবহার করে জেলার বিভিন্ন বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে পাঠদানের অনুমতি দেওয়ার কথা বলে আর্থিক লেনদেন করা হচ্ছে। অভিযোগকারীদের দাবি, জেলার প্রায় পাঁচ শতাধিক বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে ঘিরে এ ধরনের লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে। এ বিষয়ে মাদারগঞ্জ উপজেলার চরপাকেরদহ ইউনিয়নের এক শিক্ষক প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক বরাবর লিখিত অভিযোগ পাঠিয়েছেন বলে জানা গেছে। ওই অভিযোগে অফিসকেন্দ্রিক একটি সিন্ডিকেটের মাধ্যমে শিক্ষকদের কাছ থেকে আর্থিক সুবিধা নেওয়ার বিষয়টিও উল্লেখ করা হয়েছে বলে অভিযোগকারীদের দাবি।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন সরকারি ও বেসরকারি প্রাথমিক শিক্ষক অভিযোগ করেন, জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসে বিভিন্ন প্রয়োজনে গেলে অনেক ক্ষেত্রেই তাঁদের আলী আহমেদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হয়। তাঁদের দাবি, অফিসের বিভিন্ন কাজের ক্ষেত্রে তাঁর ওপর নির্ভরশীলতার সুযোগ নিয়ে আর্থিক সুবিধা চাওয়া হয়। তাঁদের ভাষ্য অনুযায়ী, চাহিদামতো অর্থ না দিলে কাজ সম্পন্ন করতে ভোগান্তির মুখে পড়তে হয়। শিক্ষকদের আরও অভিযোগ, অতীতে সংবাদপত্রে প্রতিবেদন প্রকাশ ও তদন্তের কথা শোনা গেলেও তাঁরা কার্যকর প্রতিকার পাননি বরং অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য দেওয়া ব্যক্তিদের পরবর্তী সময়ে অফিসের কাজে গিয়ে বিব্রতকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়েছে বলে তাঁদের দাবি। এ কারণে অনেকে প্রকাশ্যে অভিযোগ করতে আগ্রহী নন। তবে এসব অভিযোগের পক্ষে নির্দিষ্ট আর্থিক লেনদেনের নথি, প্রত্যক্ষ প্রমাণ কিংবা সংশ্লিষ্ট তদন্ত প্রতিবেদনের অনুলিপি পাওয়া যায়নি। ফলে অভিযোগগুলোর সত্যতা নির্ধারণে নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন। দীর্ঘদিন একই কর্মস্থলে থাকার বিষয়টি আলোচনায় অভিযোগকারীদের দাবি, আলী আহমেদের স্থায়ী ঠিকানা শেরপুর জেলার সদর উপজেলার হরিণধরা এলাকায়। অন্যদিকে, জামালপুর জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের কাছাকাছি পৌর এলাকায় তাঁর শ্বশুরবাড়ি রয়েছে। তাঁদের অভিযোগ, স্থানীয় আত্মীয়স্বজনের প্রভাবের কারণে তিনি কর্মস্থলে প্রভাব বিস্তার করে থাকেন। অভিযোগকারীদের আরও দাবি, ২০১৮ সালে তিনি জামালপুর পৌর এলাকায় প্রায় আট শতাংশ জমি কিনে সেখানে বাড়ি নির্মাণ করেন। বাড়িটির নির্মাণব্যয় প্রায় দেড় কোটি টাকা বলে তাঁরা উল্লেখ করেছেন। তবে জমির দলিল, বাড়ির নির্মাণব্যয় কিংবা অর্থের উৎসসংক্রান্ত কোনো নথি যাচাই করা সম্ভব হয়নি। তাই এসব তথ্যের ভিত্তিতে তাঁর বিরুদ্ধে কোনো অনিয়মের সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই। শিক্ষকদের দাবি, দীর্ঘদিন একই কর্মস্থলে দায়িত্ব পালনের বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের খতিয়ে দেখা উচিত। অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত করে সত্যতা পাওয়া গেলে তার বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ এবং প্রয়োজন বিবেচনায় তাঁকে অন্যত্র বদলির উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তাঁরা।
এসব অভিযোগ অস্বীকার করে উচ্চমান সহকারী কাম হিসাবরক্ষক আলী আহমেদ জানান, তিনি দীর্ঘদিন একই কর্মস্থলে চাকরি করার বিষয়টি স্বীকার করেন। তবে তাঁর বিরুদ্ধে উঠা অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ অস্বীকার করেন।
এ বিষয়ে জামালপুর জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আলী আহসানের কাছে জানতে চাইলে তিনি প্রথমে মন্তব্য করতে অনীহা প্রকাশ করেন। পরে তিনি বলেন, “আপনারা দেখেন, উনার বিরুদ্ধে কী আছে। আমার কাছে তাঁর বিরুদ্ধে কেউ অভিযোগ দেয়নি। তবে ১১ বছর ধরে তিনি একই অফিসে আছেন, এটা সত্য।” তিনি আরও বলেন, “যদি কেউ কারও কথা বলে টাকা নিয়ে থাকে, তাহলে সেই দায়ভার তার নিজের। আমি টাকার বিষয় নিয়ে তাঁকে কিছু বলিনি। আপনারা তা যাচাই করে দেখতে পারেন।”
এদিকে অভিযোগকারীদের দাবি, অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে দোষীদের বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হলে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের সেবার মান আরও বাড়বে।
মন্তব্য করুন