২১ অক্টোবর ২০২৬, ১:১২ অপরাহ্ন
অনলাইন সংস্করণ

ইটের বদলে ব্লক ব্যবহারের লক্ষ্য অধরা, নতুন করে তৎপর সরকার

ডেক্স রিপোর্

কৃষিজমির মাটি রক্ষা, ইটভাটার দূষণ কমানো এবং পরিবেশবান্ধব নির্মাণব্যবস্থা গড়ে তুলতে সরকারি নির্মাণকাজে পোড়ামাটির ইটের পরিবর্তে কংক্রিট ব্লক ব্যবহারের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছিল বিগত সরকার। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের মধ্যে সরকারি নির্মাণ, মেরামত ও সংস্কারকাজে শতভাগ ব্লক ব্যবহারের লক্ষ্য থাকলেও তা অর্জন করা যায়নি। সরকার পরিবর্তনের পর বিএনপি নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার আবারও এ উদ্যোগ বাস্তবায়নে তৎপর হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে একাধিক সভা, পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের কমিটি গঠন এবং ব্লকের ব্যবহার বাড়াতে বিভিন্ন নীতিগত পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। তবে সরকারি দপ্তরগুলোর ব্যবহারচিত্রে বড় ব্যবধান, বাজারের অনিশ্চয়তা ও বাস্তবায়নের নানা বাধা এখনো রয়ে গেছে।

২০১৯ সালের ২৪ নভেম্বর জারি করা প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, ধাপে ধাপে ব্লকের ব্যবহার বাড়িয়ে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে শতভাগে উন্নীত করার পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু নির্ধারিত সময় পেরিয়ে গেলেও সরকারি কাজে সর্বত্র ব্লকের ব্যবহার নিশ্চিত হয়নি। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে গণপূর্ত অধিদপ্তরের বিভিন্ন নির্মাণকাজে ব্লক ব্যবহারের গড় হার ছিল ৬৯ শতাংশ। বিপরীতে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরে (এলজিইডি) এ হার মাত্র ১ শতাংশ।

নতুন সরকার এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে সরকারি প্রকল্পের ক্রয় পরিকল্পনায় ব্লকের ব্যবহার অন্তর্ভুক্ত করা, দরপত্র ও নির্মাণসংশ্লিষ্ট নথিতে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনা এবং ব্লকের দাম, ভ্যাট, ট্যাক্স ও কাঁচামালের শুল্ক কমানোর বিষয় পর্যালোচনা করছে। পাশাপাশি উৎপাদন সক্ষমতা ও সরবরাহের বাস্তব পরিস্থিতি যাচাই এবং বাস্তবায়নের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণে কমিটি গঠন করা হয়েছে।

২০১৯ সালের ২৪ নভেম্বর সরকারি নির্মাণকাজে ইটের বিকল্প হিসেবে ব্লক ব্যবহারের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে প্রজ্ঞাপন জারি করে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়। কৃষিজমির মাটির ব্যবহার পর্যায়ক্রমে কমানো এবং পরিবেশের ক্ষতি নিয়ন্ত্রণের উদ্দেশ্যে নেওয়া ওই পরিকল্পনায় নির্দিষ্ট অর্থবছর ধরে ব্লকের ব্যবহার বাড়ানোর কথা বলা হয়।

পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০১৯-২০ অর্থবছরে ১০ শতাংশ, ২০২০-২১ অর্থবছরে ২০ শতাংশ, ২০২১-২২ অর্থবছরে ৩০ শতাংশ, ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৬০ শতাংশ এবং ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৮০ শতাংশ ব্লক ব্যবহারের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সরকারি নির্মাণ, মেরামত ও সংস্কারকাজে ইটের পরিবর্তে শতভাগ ব্লক ব্যবহারের লক্ষ্য ছিল।

ভবনের দেয়াল ও সীমানাপ্রাচীর, হেরিং বোন বন্ড রাস্তা এবং গ্রাম সড়ক টাইপ-বির নির্মাণ, মেরামত ও সংস্কারকাজে এ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের কথা ছিল। পরবর্তীসময়ে ২০২৫ সালের জুনের মধ্যে সরকারি কাজে পর্যায়ক্রমে শতভাগ ব্লক ব্যবহারের বাধ্যবাধকতার বিষয়টিও সামনে আসে। এ-সংক্রান্ত একটি রিটের রায়ে সরকারি প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী শতভাগ ব্লক ব্যবহারের নির্দেশনা বাস্তবায়নের বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে বলেও পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয় থেকে জানানো হয়েছে।

কিন্তু পরিকল্পনা, প্রজ্ঞাপন ও নির্দেশনা থাকার পরও সরকারি নির্মাণকাজে ব্লকের ব্যবহার সর্বত্র নিশ্চিত করা যায়নি। বাস্তবায়নে কোন সংস্থা কতটা পিছিয়ে, কেন পিছিয়ে এবং বাধাগুলো কী, সেগুলো নিয়ে এবার নতুন করে পর্যালোচনা শুরু হয়েছে।

বাংলাদেশ কংক্রিট ব্লক প্রস্তুতকারক মালিক সমিতির সহ-সভাপতি মনিরুল ইসলাম জাগো নিউজকে বলেন, সরকারি নির্মাণকাজে ইটের পরিবর্তে ব্লক ব্যবহারের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হলেও নানান কারণে তা পূরণ হয়নি। লক্ষ্যমাত্রা পূরণ না হওয়ায় ব্লক মালিকরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। তবে নতুন সরকার এ বিষয়ে আন্তরিকতা দেখিয়েছে।

নির্মাণখাতে হলো ব্লকের ব্যবহার বাড়াতে রিহ্যাবের সঙ্গে মন্ত্রীর বৈঠক
তিনি বলেন, নির্মাণকাজে ব্লকের ব্যবহার ত্বরান্বিত করতে কমিটি গঠন করা হয়েছে। আশা করি, সরকার অল্প সময়ের মধ্যে নির্মাণকাজে শতভাগ ব্লক ব্যবহারে যাবে।

সরকারি নির্মাণকাজে ব্লকের ব্যবহার বাড়াতে ২০২৬ সালের ১৮ জুলাই প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত সভায় সরকারি সব নির্মাণকাজে ব্লকের ব্যবহার নিশ্চিত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। একই সভায় অবৈধ ইটভাটা বন্ধে কার্যকর অভিযান, কাঠ পোড়ানো ইটভাটাকে অটো ইটভাটা ও ব্লক উৎপাদনে রূপান্তর, খাল খননের মাটি ইটভাটায় ব্যবহারের জন্য পাঁচ থেকে ছয়টি জেলা বাছাই এবং আমদানি করা কয়লার সালফারের পরিমাণ নির্ধারণের বিষয়েও সিদ্ধান্ত হয়।

See also  আজ বিশ্ব বাঘ দিবস, পাইকগাছায় পালিত

এরপর ৯ সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের আরেক সভায় সরকারি কাজের রেট শিডিউলে (দরসূচি) পোড়ামাটির ইটের দাম যৌক্তিকভাবে কমানো, ব্লকের ভ্যাট, ট্যাক্স ও কাঁচামালের শুল্ক কমানোর বিষয় পর্যালোচনা এবং এলজিইডির সড়কের সোলিংয়ে কংক্রিট ব্লকের বাধ্যতামূলক ব্যবহার নিশ্চিত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। মধ্যপাড়া খনির পাথর অ্যাগ্রিগেট (নির্মাণে ব্যবহৃত পাথরের উপকরণ) হিসেবে ব্যবহারের বিষয়টিও আলোচনায় আসে।

এসব সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের অগ্রগতি পর্যালোচনা করতে ৮ সেপ্টেম্বর পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় ১৩ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করে। মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (পরিবেশ দূষণ নিয়ন্ত্রণ ও আইন) ড. মো. সাইদুর রহমানকে আহ্বায়ক করে গঠিত এ কমিটিতে সংশ্লিষ্ট সরকারি প্রকৌশল দপ্তর, পরিবেশ অধিদপ্তর, রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ এবং কংক্রিট ব্লক প্রস্তুতকারক মালিক সমিতির প্রতিনিধিদের রাখা হয়েছে।

কমিটির প্রথম সভা অনুষ্ঠিত হয় গত ১৩ অক্টোবর। সভায় সরকারি প্রকৌশল দপ্তরগুলোর ব্লক ব্যবহারের অগ্রগতি পর্যালোচনা, বাস্তবায়নের প্রতিবন্ধকতা চিহ্নিতকরণ, পরিবেশ অধিদপ্তরের সংশোধিত প্রস্তাব পর্যালোচনা এবং ব্লক ব্যবহারের রোডম্যাপ নিয়ে আলোচনার বিষয় নির্ধারণ করা হয়। পাশাপাশি উন্নয়ন প্রকল্পের প্রস্তাব (ডিপিপি), প্রাক্কলন, নকশা, ড্রয়িং (নকশা), কাজের পরিমাণ ও ব্যয়ের তালিকা (বিওকিউ), দরপত্রের নথি এবং কাজের সময়সূচিতে ব্লকের ব্যবহার নিশ্চিত করার বিষয়টি গুরুত্ব পায় বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

সরকারি নির্মাণকাজে ব্লক ব্যবহারের ক্ষেত্রে বিভিন্ন সংস্থার অগ্রগতিতে বড় ধরনের পার্থক্য দেখা গেছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের পর্যালোচনা অনুযায়ী, গণপূর্ত অধিদপ্তরের বিভিন্ন নির্মাণকাজে ব্লক ব্যবহারের গড় হার ৬৯ শতাংশ। এর মধ্যে ১০ ইঞ্চি দেয়াল নির্মাণে ৮১ শতাংশ, ৫ ইঞ্চি দেয়াল নির্মাণে ৬৭ শতাংশ এবং সড়ক নির্মাণকাজে ৬০ শতাংশ ব্লক ব্যবহার করা হয়েছে।

অন্যদিকে, এলজিইডিতে ব্লক ব্যবহারের হার মাত্র ১ শতাংশ। সরকারি অবকাঠামো নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ এ সংস্থার অগ্রগতি এত কম হওয়ায় ব্লকের ব্যবহার বাড়াতে ব্যাপক পদক্ষেপ নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হয়েছে বলে জানিয়েছেন পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা।

একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, এ ব্যবধান থেকেই স্পষ্ট, শুধু একটি জাতীয় লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করলেই তা বাস্তবায়ন নিশ্চিত হয় না। কোন সংস্থার কতটুকু ব্লক প্রয়োজন, কোন ধরনের নির্মাণে তা ব্যবহার করা সম্ভব, দরপত্র ও রেট শিডিউলে (দরসূচি) কীভাবে তা অন্তর্ভুক্ত হবে এবং কাজের বাস্তবায়ন কীভাবে তদারকি করা হবে, সেসব বিষয়ে কার্যকর ব্যবস্থা প্রয়োজন।

কমিটির আহ্বায়ক ও অতিরিক্ত সচিব ড. মো. সাইদুর রহমান জাগো নিউজকে বলেন, ‘এখন সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর ক্রয় পরিকল্পনায় ব্লকের ব্যবহার অন্তর্ভুক্ত করা এবং বাস্তবায়নের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। শতভাগ ব্লকে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্য তো আগেই নির্ধারণ করা হয়েছে। সেটি বাতিল হয়নি, কিন্তু বাস্তবায়ন হয়নি। বাস্তবায়নের জন্য ব্লক সম্প্রসারণে যেসব চ্যালেঞ্জ রয়েছে, সেগুলো মোকাবিলায় যেসব সিদ্ধান্ত হয়েছে, সেগুলো কার্যকর করার মাধ্যমে উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। সরকারি যেসব স্থাপনা রয়েছে, সেখানে ধীরে ধীরে ব্লকের ব্যবহার বাড়ানোর প্রচেষ্টা চলছে। এ বিষয়ে উচ্চপর্যায়েও সিদ্ধান্ত হয়েছে। বাস্তবায়ন ও অগ্রগতি কমিটির মাধ্যমে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।’

সরকারি স্থাপনায় বর্তমানে ঠিক কত শতাংশ ব্লক ব্যবহার হচ্ছে, সে বিষয়ে একক ও সুনির্দিষ্ট চিত্র নেই জানিয়ে তিনি বলেন, বিভিন্ন সরকারি সংস্থার কার্যক্রম ও অগ্রগতিতে পার্থক্য রয়েছে। কোনো কোনো সংস্থা শতভাগ ব্লক ব্যবহার করছে, কোনো কোনো সংস্থা কাজ শুরু করেছে, আবার কোনো কোনো সংস্থা মাঝামাঝি পর্যায়ে রয়েছে। সুনির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে মূল্যায়ন করলে নির্ভরযোগ্য চিত্র পাওয়া যাবে।

তিনি আরও বলেন, সরকারি সিদ্ধান্তের পর সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সঙ্গে কাজ করা হচ্ছে এবং তাদের ক্রয় পরিকল্পনায় ব্লকের ব্যবহার অন্তর্ভুক্ত করতে বলা হচ্ছে। সংস্থাগুলো এ বিষয়ে প্রতিশ্রুতিও দিচ্ছে। তবে চলতি অর্থবছরের শুরুতে ক্রয় পরিকল্পনা তৈরির কাজ চলছে। তাই অর্থবছর শেষ হলে অগ্রগতি মূল্যায়ন করা যাবে।

সাইদুর রহমান আরও বলেন, এ মুহূর্তে নতুন করে কোনো সময়সীমা নির্ধারণ বা আগের লক্ষ্য পুনর্নির্ধারণ করা হয়নি। এখন আমরা বড় ক্রয়কারী সংস্থাগুলোর পর্যায়ে কাজ করছি, যেসব সংস্থার ক্রয়প্রক্রিয়ায় ব্লক অন্তর্ভুক্ত করার সুযোগ রয়েছে। সরকারি সিদ্ধান্ত তারা ইতিমধ্যে পেয়েছে। এখন বাস্তবে এর বাস্তবায়ন কীভাবে হয়, সেটি দেখতে চাই।

See also  মদিনার জামাত মালদ্বীপ শাখার উদ্যোগে ঈদ পুনর্মিলনী ও দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত

উৎপাদন সক্ষমতা আছে, সরবরাহের নিশ্চয়তা কতটা
সরকারি নির্মাণকাজে শতভাগ ব্লক ব্যবহারের লক্ষ্য বাস্তবায়নে উৎপাদন ও সরবরাহ সক্ষমতাও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। ব্লক উৎপাদনকারী মালিকদের তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রায় ৪০০টি কংক্রিট ব্লক কারখানা রয়েছে। প্রতিটি কারখানায় দৈনিক ৫০ হাজার ব্লক উৎপাদনের সক্ষমতা রয়েছে। সে হিসাবে বছরে প্রতিটি কারখানার উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ২ কোটি ব্লক। সব মিলিয়ে দেশে বছরে ৬০০ থেকে ৭০০ কোটি ব্লক উৎপাদনের সক্ষমতা রয়েছে বলে দাবি করেছে সংশ্লিষ্ট সংগঠন।

সংগঠনের সহ-সভাপতি বলেন, ‘ব্লক প্রস্তুতকারকরা এখন চাহিদার ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ উৎপাদন করছে। সরকার যদি ২০২৭ সালের মধ্যে শতভাগ ব্লকে যায়, আমরা চাহিদার পুরোটা সরবরাহ করতে পারব।’

দেশে সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে বছরে ২ হাজার ৩০০ কোটির মতো ইটের চাহিদা রয়েছে বলেও জানান মনিরুল ইসলাম।

তবে পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা মনে করেন, উৎপাদন সক্ষমতা এবং বাস্তবে উৎপাদিত ব্লকের পরিমাণ এক বিষয় নয়। সরকারি সংস্থাগুলোর প্রকৃত চাহিদা কত, সেই চাহিদা অনুযায়ী কারখানাগুলো সরবরাহ করতে পারবে কি না এবং উৎপাদন বাড়াতে নতুন বিনিয়োগ প্রয়োজন হবে কি না, সেগুলো যাচাই করা জরুরি।

ড. সাইদুর রহমান বলেন, সরকারি সংস্থাগুলোর ব্লকের চাহিদা এবং সেই অনুযায়ী সরবরাহ নিশ্চিত করা সম্ভব কি না, তা চলতি অর্থবছরই স্পষ্ট হবে। সংস্থাগুলোর ক্রয় পরিকল্পনায় ব্লক অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে কি না এবং সে অনুযায়ী দরপত্র আহ্বান করা হচ্ছে কি না, তা দেখা হবে। এরপর সরবরাহকারীরা চাহিদা অনুযায়ী ব্লক দিতে পারছেন কি না, তা বোঝা যাবে। চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম হলে তখন ঘাটতির বিষয়টি সামনে আসবে।

তিনি বলেন, ‘ব্লক উৎপাদনকারীরা বলছেন, তারা সরবরাহ করতে পারবেন। কিন্তু তাদের উৎপাদনক্ষমতা ও উৎপাদনের পরিমাণের ওপর সরবরাহ নির্ভর করবে। শুধু মুখের কথায় তো হবে না। এজন্যই মূল্যায়ন জরুরি। আমরা সেই মূল্যায়ন করব।’

এদিকে দেশে ইটভাটার উৎপাদন সক্ষমতার চিত্রও বড়। সরকারি সংস্থা ও সংশ্লিষ্ট সংগঠনের সর্বশেষ জরিপের তথ্য অনুযায়ী, আধুনিক প্রযুক্তির জিগজ্যাগ, হাইব্রিড হফম্যান ও টানেল কিলন ইটভাটার সম্মিলিত বার্ষিক উৎপাদন সক্ষমতা ৪ হাজার ৭২২ কোটি ৬০ লাখ ইট। অন্যদিকে, ড্রাম চিমনি, ফিক্সড চিমনি ও কাঠ পোড়ানো ইটভাটার সম্মিলিত উৎপাদন সক্ষমতা ৭০৪ কোটি ৯০ লাখ ইট। উপস্থাপনায় এসব শ্রেণির ইটভাটার সম্মিলিত উৎপাদন সক্ষমতা ৫ হাজার ৪২৭ কোটি ৫০ লাখ ইট হিসেবে উঠে এসেছে।

২০২৬ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশে মোট ইটভাটার সংখ্যা ৭ হাজার ৪৮১টি এবং বছরে প্রায় ৪ হাজার ৫০০ কোটি ইট উৎপাদনের তথ্য দিয়েছে পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়।

পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ইটের বিকল্প হিসেবে ব্লক ব্যবহারের মূল যুক্তি শুধু নির্মাণসামগ্রী পরিবর্তন নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে কৃষিজমি, পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের প্রশ্ন। দেশে ইট তৈরির জন্য বছরে প্রায় ৫৩ কোটি ঘনফুট কৃষিজমির মাটি কাটা হয়। ইটভাটায় পোড়ামাটির ইট উৎপাদনের জন্য কৃষিজমির ওপরের প্রায় ১৫ সেন্টিমিটার মাটি বা টপ সয়েল (উপরের মাটি) অপসারণ করা হলে মাটির পুষ্টি উপাদান নষ্ট হয়। এতে ফসলের ফলন ১৫ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে।

পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের পরিবেশ দূষণ নিয়ন্ত্রণ অনুবিভাগের এক উপস্থাপনা থেকে জানা গেছে, দেশের বায়ুদূষণের উৎসগুলোর মধ্যে ইটভাটার অবদান ১৩ শতাংশ। কয়লার সালফারজনিত দূষণ এবং ইটভাটার নির্গমন জনস্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকি তৈরি করে। বিশ্বব্যাংকের ২০২২ সালের তথ্যের বরাতে উপস্থাপনায় বলা হয়েছে, পারিপার্শ্বিক ও ঘরের ভেতরের বায়ুদূষণের কারণে বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ৮ দশমিক ৩ শতাংশ ক্ষতি হয়। বায়ুদূষণের কারণে বছরে ১ লাখ ৫৯ হাজার মানুষের অকালমৃত্যুর তথ্যও সেখানে তুলে ধরা হয়েছে।

See also  প্রধানমন্ত্রীর গবেষণা কর্মকর্তা হলেন সাত্তার পাটোয়ারী

এসব ক্ষতি কমাতে ইটের বিকল্প হিসেবে পরিবেশবান্ধব নির্মাণসামগ্রীর ব্যবহার বাড়ানোর কথা বলা হচ্ছে। তবে ব্লকের পরিবেশগত সুবিধা নিশ্চিত করতে উৎপাদনের ধরন, কাঁচামাল, জ্বালানি ব্যবহার এবং নির্মাণে এর উপযুক্ত প্রয়োগের বিষয়গুলোও বিবেচনায় রাখতে হবে বলে জানিয়েছেন কর্মকর্তারা।

দাম, দক্ষতা ও নীতিগত সুবিধার প্রশ্ন
ব্লকের ব্যবহার বাড়ানোর ক্ষেত্রে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, ইটের তুলনায় ব্লক ব্যবহার করলে নির্মাণব্যয় কমে কি না। এ বিষয়ে ড. সাইদুর রহমানের বক্তব্য, শুধু পণ্যের দাম তুলনা করে সাশ্রয়ের হিসাব করা যাবে না। ব্লক ব্যবহারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট শ্রমিক ও অন্যান্য ব্যবহারকারীর দক্ষতাও গুরুত্বপূর্ণ।

তিনি বলেন, কম দামে ব্লক কেনা গেলেও সঠিকভাবে ব্যবহার করতে না পারলে প্রত্যাশিত সাশ্রয় পাওয়া যাবে না। ব্লক সাশ্রয়ী দামে কেনা যায়, সে জন্য নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি যারা ব্লক ব্যবহার করেন, তাদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার মতো কর্মসূচিও নেওয়া হচ্ছে।

তিনি বলেন, ‘আমার লক্ষ্য বাস্তবায়ন করতে হলে এসব আনুষঙ্গিক বিষয়ও দেখতে হবে। এগুলো বিবেচনায় না নিলে লক্ষ্য বাস্তবায়ন খাপছাড়া হয়ে যাবে। এবার আমরা এভাবেই এগোচ্ছি।’

এদিকে বাংলাদেশ কংক্রিট ব্লক প্রস্তুতকারক মালিক সমিতি বলছে, দেশে এরইমধ্যে প্রায় ৪০০টি ব্লক উৎপাদন প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়েছে। কিন্তু সরকারি নির্মাণকাজে পর্যাপ্ত ব্যবহার, বাজারের নিশ্চয়তা, আর্থিক সহায়তা ও নীতিগত সুবিধার অভাবে অনেক উদ্যোক্তা বিনিয়োগ করেও প্রত্যাশিত বাজার পাচ্ছেন না।

গত ১৩ অক্টোবর নির্মাণকাজে পরিবেশবান্ধব ব্লকের ব্যবহার নিশ্চিতকরণ ও অগ্রগতি পর্যালোচনা সংক্রান্ত কমিটির কাছে দেওয়া প্রস্তাবে সমিতি পূর্ববর্তী সরকারি প্রজ্ঞাপন ও রোডম্যাপের বাস্তবায়ন অগ্রগতি পর্যালোচনা করে আগামী ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে ঘাটতি, প্রতিবন্ধকতা ও করণীয় নির্ধারণের সুপারিশ করেছে।

সমিতির প্রস্তাবে গণপূর্ত অধিদপ্তর, এলজিইডি, সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর, পানি উন্নয়ন বোর্ড, শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর ও রাজউকসহ সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থার জন্য সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা, দায়িত্ব ও সময়সীমা নির্ধারণের কথা বলা হয়েছে। সরকারি নির্মাণকাজে প্রযোজ্য ক্ষেত্রে ব্লকের ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা, নির্দিষ্ট চূড়ান্ত সময়সীমার মধ্যে শতভাগ ব্যবহার নিশ্চিত করা এবং সরকারি আদেশ, কারিগরি নির্দেশনা, নকশা ও বিওকিউ সংশোধনের প্রস্তাবও দিয়েছে সংগঠনটি।

এছাড়া সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর অগ্রগতি প্রতি তিন মাস অন্তর পর্যালোচনা, লিখিত প্রতিবেদন গ্রহণ এবং বাস্তবায়নের প্রতিবন্ধকতা দ্রুত নিরসনের সুপারিশ করা হয়েছে। সরকারি প্রকল্পে ব্লকের ব্যবহার নিশ্চিত করতে মনিটরিং কমিটি গঠন এবং নিয়মিত অগ্রগতি প্রতিবেদন বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাবও রয়েছে। এ কমিটিতে সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থার পাশাপাশি ব্লক প্রস্তুতকারক মালিক সমিতির প্রতিনিধিদের অন্তর্ভুক্ত করার কথা বলা হয়েছে।

ইটভাটা থেকে ব্লক কারখানায় রূপান্তরের উদ্যোগ
ব্লকের ব্যবহার বাড়ানোর পাশাপাশি ইটভাটার মালিকদের বিকল্প উৎপাদনে উৎসাহিত করার বিষয়টিও সরকারের পরিকল্পনায় রয়েছে। ইটভাটার পরিবেশগত প্রভাব এবং আইনগত সীমাবদ্ধতার কারণে অনেক মালিককে ব্যবসা পরিচালনায় সমস্যায় পড়তে হচ্ছে বলে মনে করেন ড. সাইদুর রহমান।

তিনি বলেন, ইটভাটার মালিকদের ব্লক উৎপাদন ও ব্যবহারের দিকে আসতে উৎসাহিত করা হচ্ছে, যাতে তারা আইনগত জটিলতা এড়িয়ে নির্বিঘ্নে ব্যবসা পরিচালনা করতে পারেন। অনেক মালিক লাইসেন্সসহ বিভিন্ন সমস্যার মুখে পড়ছেন। কেউ ইটভাটা বন্ধ করছেন, আবার কেউ বিকল্প কার্যক্রমের দিকে যাচ্ছেন। সরকার ব্লকের ব্যবহার বাড়াতে পারলে এবং সরকারি সংস্থাগুলো বাস্তবে ব্লক কিনলে এ খাতের প্রসার ঘটবে।

ইটভাটা স্থাপন ও পরিচালনার ক্ষেত্রে আইনগত বিধিনিষেধও রয়েছে। ‘ইট প্রস্তুত ও ভাটা স্থাপন আইন, ২০১৩’-এর ৮ (৩) ধারার অধীনে আবাসিক এলাকা, বনাঞ্চল, পৌরসভা ও পরিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা থেকে ন্যূনতম এক কিলোমিটার দূরত্ব বজায় রাখার বিধানের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

সরকারি বনাঞ্চলের সীমানা থেকে দুই কিলোমিটার এবং পাহাড় বা টিলার পাদদেশ থেকে আধা কিলোমিটার দূরত্বের কথাও বলা হয়েছে।

Facebook Comments Box

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

তুরস্ক-পাকিস্তান-কাতার ও ইন্দোনেশিয়ার মধ্যে প্রতিরক্ষা চুক্তি সই

১

ইটের বদলে ব্লক ব্যবহারের লক্ষ্য অধরা, নতুন করে তৎপর সরকার

২

ডেঙ্গুতে পাঁচজনের মৃত্যু, হাসপাতালে ১৩৬৬

৩

নাটোরে বাস ও ট্রাকের সংঘর্ষে ১২ জন নিহত

৪

কুমেক হাসপাতালে টয়লেটের সামনে রোগীর চিকিৎসা !

৫

কুমিল্লার নাঙ্গলকোটে কর্ণফুলী ট্রেনের ইঞ্জিন ও ৪বগি লাইনচ্যুত! তদন্ত কমিটি 

৬

রাষ্ট্রে সব ধর্মের মানুষের জন্য সমান অধিকার

৭

চীনা ব্যাংকের কার্যক্রম শুরুর সুযোগ তুলে ধরলো ইনভেস্ট বাংলাদেশ

৮

অতিরিক্ত ডিআইজির ভাড়া দেওয়া বাড়িতে চলতো ডিজে পার্টি, নারীসহ আটক ৮৪

৯

বন্ধ কল-কারখানা চালু করে কর্মসংস্থান বাড়াতে চাই: প্রধানমন্ত্রী

১০

দেবিদ্বারে দুর্গাপূজার মণ্ডপ পরিদর্শনে চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী হেলাল উদ্দিন সরকার

১১

রাশিয়ার যুদ্ধে নিহত কুমিল্লার সাগরের মরদেহ ফেরত চায় বাবা-মা

১২

চৌদ্দগ্রাম পাইলট বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের সভাপতি হলেন সাংবাদিক সাদিয়া রেজওয়ানা তন্বী

১৩

টুপটুপ রিসোর্টে আগুনে ঢাবি শিক্ষার্থী নাফিজ ও তার পরিবারের ৬ জন নি হত

১৪

রাজনীতিবিদরা ইতিহাস লেখায় মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃত হয়েছে: স্পিকার

১৫

দুর্গাপূজায় অপ্রয়োজনীয় আলোকসজ্জা-উচ্চ শব্দে মাইক নিষিদ্ধ করতে নির্দেশনা

১৬

সাড়ে চার ঘণ্টায় ১৩ জায়গা পরিদর্শন করলেন প্রধানমন্ত্রী, আজিমপুরে অপরিচ্ছন্নতায় অসন্তোষ

১৭

নিয়মবহির্ভূত কর্মকাণ্ডও পরিচ্ছন্নতা অভিযানের আওতায় আসবে: কৃষিমন্ত্রী ইয়াছিন

১৮

পুরো পরিবারের ওমরাহ যাত্রার আনন্দ পরিণত হলো বিষাদে

১৯

কক্সবাজারে রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ডে নিহতের ঘটনায় জামায়াতের শোক

২০