মোঃ ইব্রাহীম মিঞা, দিনাজপুর প্রতিনিধি:
দিনাজপুরের বিরামপুর পৌর শহরসহ উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের জনবসতিপূর্ণ এলাকায় বেওয়ারিশ কুকুরের দলবদ্ধ চলাচলে পথচারী, শিক্ষার্থী ও স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। বিশেষ করে পৌর শহরের বড় মাঠ ও আশপাশের সড়কে একসঙ্গে ১৫ থেকে ২০টি কুকুর নিয়মিত ঘোরাফেরা করতে দেখা যায় বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা। এতে শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি, শিক্ষার্থী ও একাকী পথচারীদের চলাচলের পাশাপাশি মাঠে খেলাধুলার সময়ও আতঙ্ক তৈরি হচ্ছে।
বড় মাঠের পাশেই রয়েছে বিরামপুর পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়, মহিলা কলেজ, কিন্ডারগার্টেনসহ কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। প্রতিদিন এসব প্রতিষ্ঠানে যাতায়াতের সময় কুকুরের দল দেখে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের বাড়তি সতর্ক থাকতে হচ্ছে। বিশেষ করে সকাল ও ছুটির সময়ে শিক্ষার্থীদের চলাচল বেশি থাকায় অভিভাবকদের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, কখনো কখনো কুকুরের দল পথচারীদের পিছু নেওয়া কিংবা তেড়ে আসার মতো পরিস্থিতি তৈরি করে। এতে কেউ দ্রুত রাস্তা পরিবর্তন করেন, আবার কেউ পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকেন। ছোট শিশুদের ক্ষেত্রে আতঙ্ক আরও বেশি হওয়ায় অনেক অভিভাবক সন্তানদের একা স্কুলে পাঠাতেও স্বস্তি বোধ করছেন না।
স্থানীয়রা জানান, সমস্যাটি শুধু পৌর শহর বা বড় মাঠকেন্দ্রিক নয়। উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের গ্রাম ও জনবসতিপূর্ণ এলাকাতেও বেওয়ারিশ কুকুরের দলবদ্ধ চলাচল চোখে পড়ছে। ফলে বিষয়টি উপজেলা পর্যায়ে জননিরাপত্তা ও জনস্বাস্থ্যের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি সমস্যা হয়ে উঠেছে বলে মনে করছেন তারা।
বিরামপুর প্রাণিসম্পদ দপ্তর ও ভেটেরিনারি হাসপাতালের ভেটেরিনারি সার্জন ডা. কুমার জ্যোতির্ময় রায় বলেন, কুকুরের কামড়ে আহত ছাগল ও ভেড়া চিকিৎসার জন্য প্রতি মাসে গড়ে ৮ থেকে ৯টি আসে। এর মধ্যে বছরে দুই-তিনটি গুরুতর অবস্থায় আসে। কোনো কোনো ছাগলের মেরুদণ্ড ভেঙে যায় কিংবা গলা ও শরীরের গুরুত্বপূর্ণ স্থানে কামড়ের কারণে তাদের সুস্থ করে তোলা সম্ভব হয় না।
বিরামপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. শাহরিয়ার পারভেজ বলেন, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত কুকুর, বিড়াল ও শিয়ালের কামড়ের ঘটনায় প্রায় ১ হাজার ৩০০ রোগী চিকিৎসার আওতায় এসেছেন। এর মধ্যে আনুমানিক ৪০০ থেকে ৫০০ জন কুকুরের কামড়ের শিকার। প্রতি মাসে গড়ে ১৮০ থেকে ২০০ জন কুকুর, বিড়াল ও শিয়ালের কামড়ের ঘটনায় চিকিৎসা নিতে আসছেন।
তিনি বলেন, রোগীদের প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসা ও জলাতঙ্ক প্রতিরোধী টিকা দেওয়া হচ্ছে। তবে কামড়ের ঘটনা কমাতে জনসচেতনতার পাশাপাশি বেওয়ারিশ কুকুর ব্যবস্থাপনায় কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন।
বিরামপুর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. সুব্রত কুমার সেন বলেন, কুকুরের কামড়ের রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। তাই মানুষকে সচেতন হওয়ার পাশাপাশি ঝুঁকিপূর্ণ ও অসুস্থ কুকুর শনাক্ত করে প্রয়োজনীয় ভ্যাকসিন কার্যক্রমের আওতায় আনা জরুরি।
তিনি বলেন, কুকুর নিধনের পরিবর্তে প্রচলিত আইন ও আদালতের নির্দেশনা অনুসরণ করে মানবিক পদ্ধতিতে কুকুর ব্যবস্থাপনা করা উচিত। এতে মানুষের নিরাপত্তার পাশাপাশি প্রাণিকল্যাণের বিষয়টিও গুরুত্ব পাবে।
স্থানীয়দের দাবি, বেওয়ারিশ কুকুর নিধন কোনো স্থায়ী সমাধান নয়। অসুস্থ বা আক্রমণাত্মক কুকুর শনাক্তকরণ, জলাতঙ্ক প্রতিরোধী টিকাদান, বন্ধ্যাকরণ, প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে পরিকল্পিতভাবে দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা যেতে পারে।
তারা জানান, ২০১৮ সালের দিকে বেওয়ারিশ কুকুরকে ভ্যাকসিন দেওয়ার পর গায়ে লাল রং দিয়ে চিহ্নিত করা হয়েছিল। এরপর দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও এ ধরনের কার্যক্রম আর দৃশ্যমান হয়নি। এ নিয়ে বিভিন্ন সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও পৌর কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছে বলে জানান স্থানীয়রা। তাদের মতে, বিষয়টি নতুন করে গুরুত্ব দিয়ে সমন্বিত ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম শুরু করা প্রয়োজন।
স্থানীয়রা আরও দাবি করেন, পৌর শহরের পাশাপাশি উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে জরিপ করে বেওয়ারিশ কুকুরের সংখ্যা, অবস্থান ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা চিহ্নিত করা দরকার। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, বাজার, হাসপাতাল, খেলার মাঠ ও অন্যান্য জনবহুল স্থানে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান তারা।
এ বিষয়ে বিরামপুর পৌর প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোছাঃ তানজিনা খাতুন বলেন, সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে মাইকিংসহ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
স্থানীয়দের প্রত্যাশা, জননিরাপত্তা ও প্রাণিকল্যাণ—দুই দিক বিবেচনায় নিয়ে বিরামপুর পৌর শহরসহ পুরো উপজেলায় বেওয়ারিশ কুকুর ব্যবস্থাপনায় নিয়মিত, পরিকল্পিত ও মানবিক কার্যক্রম চালু করা হবে। এতে পথচারী, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের উদ্বেগ কমার পাশাপাশি মানুষ ও প্রাণীর সহাবস্থান আরও নিরাপদ হবে।
মন্তব্য করুন