ডেক্স রিপোর্ট:
পোশাকশ্রমিকদের আন্দোলনে অর্থায়ন ও জনবল দিয়ে সহায়তার অভিযোগে সাত শিল্প গ্রুপের প্রায় ২২৫টি প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তিকে চিহ্নিত করেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। এর মধ্যে প্রায় ১০০ ব্যক্তির ব্যাংক হিসাব জব্দ করতে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ১২৫টি প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক লেনদেনের বিস্তারিত তথ্য চেয়েছে সংস্থাটি। তবে এ বিষয়ে প্রতিষ্ঠানগুলোর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
শ্রমিকদের বেতন-ভাতার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে সন্দেহভাজন প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যাংক হিসাব জব্দ না করে আপাতত লেনদেনের তথ্য তলব করা হয়েছে। এনবিআর সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) এনবিআরের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সেল (সিআইসি) দেশের সব ব্যাংকে এ-সংক্রান্ত জরুরি নির্দেশনা পাঠিয়েছে। জানা গেছে, এসব প্রতিষ্ঠানের মালিকানায় রয়েছেন সাবেক মন্ত্রী, সংসদ সদস্য এবং বিগত সরকারের ঘনিষ্ঠ ব্যবসায়ীরা।
এর আগে মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) এনবিআরের এক অনুষ্ঠানে সংস্থাটির চেয়ারম্যান আহসান হাবিব কয়েকজন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাব জব্দের ইঙ্গিত দেন। তিনি জানান, বিশেষ একটি কারণে কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সেল (সিআইসি) ও আয়কর গোয়েন্দা বিভাগ ৩৪ ব্যক্তি ও ৩৪ পরিবারের ব্যাংক হিসাব জব্দের কার্যক্রম চালাচ্ছে।
এনবিআরের আরেকটি সূত্র জানায়, সুনির্দিষ্ট গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে এসব ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাব জব্দের কার্যক্রম শুরু হয়েছে। এরই মধ্যে ব্যাংকগুলোকে ই-মেইলের মাধ্যমে সংশ্লিষ্টদের তালিকা পাঠিয়ে তাঁদের হিসাবের লেনদেন স্থগিতের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
ব্যাংক হিসাব জব্দের তালিকায় দেশের শীর্ষস্থানীয় কয়েকটি শিল্প গ্রুপের মালিক, সাবেক মন্ত্রী, সংসদ সদস্য ও রাজনৈতিক ব্যক্তিরা রয়েছেন। তাদের বেশিরভাগই কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত অথবা আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা পেয়েছেন।
এনভয় গ্রুপ
সাত শিল্প গ্রুপের ১২০টি প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাবের তথ্য চেয়েছে এনবিআর। এর মধ্যে এনভয় গ্রুপের পাঁচটি প্রতিষ্ঠান ও পাঁচ ব্যক্তির নাম রয়েছে।
প্রতিষ্ঠানগুলো হলো- এনভয় গার্মেন্টস লিমিটেড, এনভয় প্যাকেজেস লিমিটেড, এনভয় ডিজাইন লিমিটেড, এনভয় ফ্যাশনস লিমিটেড ও এনভয় টেকনোলজিস লিমিটেড।
তালিকায় থাকা ব্যক্তিরা হলেন- গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও সাবেক সংসদ সদস্য আবদুস সালাম মুর্শেদি, তার স্ত্রী মিস শারমিন সালাম, মেয়ে মিস শাহরিন সালাম ওশী এবং গ্রুপ-সংশ্লিষ্ট মিস রাশিদা আহমেদ ও তানভীর আহমেদ।
মন্ডল গ্রুপ
মন্ডল গ্রুপের ৪৭ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের নাম রয়েছে তালিকায়। প্রতিষ্ঠানগুলো হলো— মন্ডল ইন্টিমেটস লিমিটেড, কটন ফিল্ড (বিডি) লিমিটেড, কটন ক্লাব (বিডি) লিমিটেড, কটন ক্লোথিং (বিডি) লিমিটেড, মন্ডল ফেব্রিকস লিমিটেড, ট্রপিক্যাল নিটেক্স লিমিটেড, মার্ক সোয়েটার লিমিটেড, মন ট্রিমস লিমিটেড, মন্ডল স্পিনিং মিলস লিমিটেড, মন্ডল ফার্মিং অ্যান্ড ফুড প্রসেসিং লিমিটেড (যা পূর্বে মন্ডল অটো ব্রিকস লিমিটেড নামে পরিচিত ছিল), আলিম নিট (বিডি) লিমিটেড, মন্ডল সিকিউরিটিজ লিমিটেড, অ্যাপোলো ফ্যাশন লিমিটেড, ট্রিমস ইন্টারন্যাশনাল (বিডি) লিমিটেড, ইকো ইন্টিমেটস লিমিটেড, নূর চেকস অ্যান্ড স্ট্রাইপস লিমিটেড, অ্যাপোলো নিটওয়্যার (বিডি) লিমিটেড, অ্যাপোলো প্যাকেজিং (বিডি) লিমিটেড, কটন ক্লাউট (বিডি) লিমিটেড, নিটেক্স ড্রেসেস লিমিটেড, এমব্রেলা লিমিটেড, মন্ডল অ্যান্ড কোং লিমিটেড, মন্ডল নিট কম্পোজিট লিমিটেড, মন্ডল নিটওয়্যারস লিমিটেড, মন্ডল ইয়ার্ন ডাইং লিমিটেড, মনটেক্স ফেব্রিক্স লিমিটেড, পানামা অ্যাগ্রো কমপ্লেক্স লিমিটেড ও জিগজ্যাগ স্টুডিও (বিডি) লিমিটেড।
ব্যক্তিদের মধ্যে রয়েছেন আব্দুল আলিম মন্ডল, তারিন তাসলিমা, মো. জুবায়ের মন্ডল, মোসা. সুলতানা খাতুন, মাসুদা খাতুন, হাজী আব্দুল মান্নান মন্ডল, মোমেনা খাতুন, আব্দুল মোমিন মন্ডল, মাহমুদুল হাসান, জান্নাতুল ফেরদৌস, আসাদুর রহমান সিকদার, গোলাম ফারুক তালুকদার, মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন, সুরাভী রহমান, শেরিন সুলতানা, তাসলিমা আক্তার, খন্দকার ফারুক কায়সার, নাহিদ খন্দকার ও হাজী আব্দুল মজিদ মন্ডল।
বাংলাদেশের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় পোশাক প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান মন্ডল গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আব্দুল মোমিন মন্ডল।
গিভেন্সি গ্রুপ
গিভেন্সি গ্রুপের নয় ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের নাম রয়েছে তালিকায়। প্রতিষ্ঠানগুলো হলো-গিভেন্সি গার্মেন্টস লিমিটেড, গিভেন্সি স্পিনিং মিলস লিমিটেড, গিভেন্সি গার্মেন্টস অ্যাকসেসরিজ লিমিটেড, গিভেন্সি ইয়ার্ন ডাইং লিমিটেড ও গিভেন্সি ফুডস অ্যান্ড অ্যাসেনশিয়ালস লিমিটেড।
ব্যক্তিদের মধ্যে রয়েছেন খতিব আব্দুল জাহিদ মুকুল, মাসুমা খাতুন লিপা, মিসেস মাহমুদা খাতুন ও খতিব আব্দুল হাদী।
প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক খতিব আব্দুল জাহিদ মুকুল। এছাড়া প্রশাসনের দায়িত্বে ও পরিচালক হিসেবে রয়েছেন মাসুমা খাতুন লিপা।
স্ট্যান্ডার্ড গ্রুপ
স্ট্যান্ডার্ড গ্রুপের ১১ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের নাম রয়েছে তালিকায়। প্রতিষ্ঠানগুলো হলো-স্ট্যান্ডার্ড গার্মেন্টস ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড, দ্য সিভিল ইঞ্জিনিয়ার্স লিমিটেড-সাগর ইনফো বিল্ডার্স লিমিটেড, জেভি ও দ্য সিভিল ইঞ্জিনিয়ার্স লিমিটেড।
ব্যক্তিদের মধ্যে রয়েছেন হোসনে আরা বেগম, ইঞ্জি. মো. আতিকুর রহমান, মাহমুদা বেগম, ইঞ্জি. এ কে এম মোশাররফ হোসেন, তাসমিয়াহ রহমান, হাসনাত মোশাররফ, ফারিয়া রহমান, ফাহিম মোশাররফ ও হাসিব মোশাররফ।
বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় তৈরি পোশাক উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান স্ট্যান্ডার্ড গ্রুপের প্রধান কর্ণধার এ. কে. এম. মোশাররফ হুসাইন। ইঞ্জিনিয়ার মো. আতিকুর রহমান চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
নিপা গ্রুপ
নিপা গ্রুপের ছয় ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের নাম রয়েছে তালিকায়। প্রতিষ্ঠানগুলো হলো—নিপা নিট ওয়ার কোম্পানি, সেলিনা অ্যাপারেলস লিমিটেড ও নিপা ফ্যাশন ওয়ার ইন্ডাস্ট্রি লিমিটেড।
ব্যক্তিদের মধ্যে রয়েছেন সানজিদ চৌধুরি, খসরু চৌধুরি, এম মুনিরুল ইসলাম ও মো. টিপু সুলতান। খসরু চৌধুরি প্রতিষ্ঠানটির এমডি ও সিইও।
ওয়েল গ্রুপ
চট্টগ্রামভিত্তিক ওয়েল গ্রুপের ১৫ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের নাম রয়েছে তালিকায়। প্রতিষ্ঠানগুলো হলো- ওয়েল অ্যাকসেসরিজ লিমিটেড, ওয়েল গ্রুপ, ওয়েল ফ্যাশন লিমিটেড ও ওয়েল ফুড অ্যান্ড বেভারেজ কোম্পানি লিমিটেড।
গ্রুপ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মধ্যে রয়েছেন মিসেস নাসরিন আক্তার, আবদুস সালাম, সৈয়দ নুরুল ইসলাম, সৈয়দ সিরাজুল ইসলাম, সৈয়দ নজরুল ইসলাম, সৈয়দ শহীদুল ইসলাম, সৈয়দ তরিকুল ইসলাম, মো. আসিফ হাসান, মিসেস জান্নাতুল ইসলাম, মিসেস আফরোজা বেগম, ড. (মিসেস) নাসরিন আফরোজ, মিস আকতারুনিসা ও মিস জিনাত ইসলাম।
ওয়েল গ্রুপের চেয়ারম্যান আবদুচ সালাম আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য ছিলেন।
তুসুকা গ্রুপ
তুসুকা গ্রুপের ২০ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের নাম রয়েছে তালিকায়। প্রতিষ্ঠানগুলো হলো— তুসুকা প্যাকেজিং লিমিটেড, তুসুকা স্টিচেস লিমিটেড, তুসুকা অ্যাপারেলস লিমিটেড, তুসুকা ফ্যাশনস লিমিটেড, তুসুকা ওয়াশিং লিমিটেড, তুসুকা প্রসেসিং লিমিটেড, তুসুকা ডেনিম লিমিটেড, তুসুকা জিন্স লিমিটেড ও তুসুকা ট্রাউজার্স লিমিটেড।
তুসুকা গ্রুপের চেয়ারম্যান আরশাদ জামাল, এমডি ফয়জুর রহমান ছাড়াও তালিকায় রয়েছেন ফিরোজ আলম, মো. রাফায়েত উল্লাহ খান, মো. শফিকুল ইসলাম, মো. ইকবাল কবির, একরামুল হক, মো. আতিকুজ্জামান (সাগর) ও মো. আতিকুজ্জামান (রিপন)।
তালিকায় বিজিএমইএর সাবেক সভাপতি এস এম আবদুল মান্নান, তার পরিবারের সদস্য ফরিদা মান্নানসহ আরও কয়েকজনের নাম রয়েছে। এছাড়া রয়েছেন মিরপুরের সাবেক সংসদ সদস্য ইলিয়াস মোল্লা ও তার পরিবারের সদস্যরা। মিরপুর এলাকায় শ্রমিক বিক্ষোভে ইলিয়াস মোল্লার সংশ্লিষ্টতা রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তবে এনবিআর আরও একাধিক সূত্র জানায়, জব্দের তালিকায় আরও একাধিক ব্যক্তি এ প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাব যুক্ত হতে পারে। এ সংখ্যা শতাধিক। আবার তাদের মধ্যে অনেকেরই দুদক বা অন্য সংস্থার আবেদনে আগে থেকেই ব্যাংক হিসান জব্দ রয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা বলেন, প্রতিদিনই তালিকা হালনাগাদ হচ্ছে। পূর্ণাঙ্গ তথ্য পরে জানানো হবে।
জানা গেছে, ব্যাংক হিসাব জব্দের তালিকায় রয়েছেন সিপাল গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা ও সাবেক বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি এবং বেক্সিমকো গ্রুপের মালিক ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার শিল্প ও বেসরকারি বিনিয়োগ-বিষয়ক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান।
সম্প্রতি সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেছেন, পোশাক খাতের চলমান অস্থিরতার পেছনে নিষিদ্ধ রাজনৈতিক সংগঠনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সাবেক মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও সংসদ সদস্যদের ইন্ধন রয়েছে। এ কাজে কিছু শিল্প মালিকও জড়িত বলে সরকারের কাছে তথ্য-প্রমাণ রয়েছে। কয়েকদিন ধরেই পোশাক শ্রমিকরা ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা করার জন্য আন্দোলন করছেন।
মন্তব্য করুন