মোঃ ইব্রাহীম মিঞা বিরামপুর দিনাজপুর প্রতিনিধি:
দিনাজপুরের বিরামপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সরকারি অ্যাম্বুলেন্স থাকলেও দীর্ঘদিন ধরে চালক বরখাস্ত থাকায় জরুরি রোগীদের পড়তে হচ্ছে চরম ভোগান্তিতে। বিশেষ করে দিনমজুর ও নিম্নআয়ের রোগীদের উন্নত চিকিৎসার জন্য দিনাজপুর কিংবা রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিতে গিয়ে নির্ভর করতে হচ্ছে বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্সের ওপর। এতে সরকারি নির্ধারিত ভাড়ার তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ টাকা গুনতে হচ্ছে রোগীর স্বজনদের।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সরকারি অ্যাম্বুলেন্স চালক কামরুজ্জামান পারিবারিক একটি মামলাজনিত কারণে গত বছরের ডিসেম্বর মাস থেকে বরখাস্ত রয়েছেন। এরপর থেকেই সরকারি অ্যাম্বুলেন্সটি কার্যত চালকশূন্য হয়ে পড়ে আছে। জরুরি রোগী রেফার করা হলেও সরকারি অ্যাম্বুলেন্স না পাওয়ায় স্বজনদের বাধ্য হয়ে বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্স ভাড়া করতে হচ্ছে।
সম্প্রতি এর ভুক্তভোগী হয়েছেন বিরামপুর পৌরসভার পরিচ্ছন্নতাকর্মী স্বপন হেমব্রম। তিনি প্রায় তিন বছর ধরে পৌরসভায় পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে কাজ করছেন। তাঁর স্ত্রী জয়ন্তী মার্ডিকে ২৬ দিন আগে দিনাজপুরের একটি ক্লিনিকে সিজার করা হয়। পরে হঠাৎ তাঁর স্ত্রীর শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে প্রচুর রক্তক্ষরণের কারণে জরুরি ভিত্তিতে দিনাজপুরে নেওয়ার প্রয়োজন দেখা দেয়।
হাসপাতালে সরকারি অ্যাম্বুলেন্স থাকা সত্ত্বেও চালক না থাকায় বাধ্য হয়ে বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্সের দ্বারস্থ হন স্বপন। দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করে টাকা সংগ্রহ করে শেষ পর্যন্ত ২ হাজার ৫০০ টাকা ভাড়ায় অ্যাম্বুলেন্স নিয়ে স্ত্রীকে দিনাজপুরের উদ্দেশে রওনা দেন তিনি।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে স্বপন হেমব্রম বলেন, “আমি একজন দিনমজুর ও পরিচ্ছন্নতাকর্মী। এত টাকা আমি কোথায় পাব? সরকারি অ্যাম্বুলেন্সের চালক থাকলে হয়তো এক হাজার থেকে ১ হাজার ২০০ টাকার মধ্যে স্ত্রীকে দিনাজপুরে নিয়ে যেতে পারতাম। কিন্তু চালক না থাকায় বাধ্য হয়ে ২ হাজার ৫০০ টাকা দিতে হয়েছে।”
স্থানীয়দের অভিযোগ, বিরামপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটি উপজেলার প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত হওয়ায় প্রতিদিন বিভিন্ন গুরুতর ও জরুরি রোগীকে উন্নত চিকিৎসার জন্য দিনাজপুর ও রংপুরে রেফার করা হয়। এ অবস্থায় হাসপাতালে সরকারি অ্যাম্বুলেন্স থাকলেও চালক না থাকায় সেটি রোগীদের কোনো কাজে আসছে না। ফলে জরুরি মুহূর্তে রোগীর স্বজনদের বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্সের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।
অভিযোগ রয়েছে, এ সুযোগকে কেন্দ্র করে হাসপাতাল এলাকায় বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্সের একটি চক্র বা সিন্ডিকেট সক্রিয় রয়েছে। তবে এ বিষয়ে বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্স চালকদের বক্তব্য জানতে চাইলে তারা সরাসরি কোনো বক্তব্য দিতে রাজি হননি। তারা জানান, সমিতির সদস্যরা একসঙ্গে বসে এ বিষয়ে কথা বলবেন।
এদিকে সরকারি অ্যাম্বুলেন্সের চালক বরখাস্ত থাকাকালীন তাঁর নিজস্ব একটি অ্যাম্বুলেন্স উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চলাচল করছে—এমন অভিযোগও উঠেছে। বিষয়টি নিয়েও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
সরকারি নিয়ম অনুযায়ী জরুরি রোগী পরিবহনে সরকারি অ্যাম্বুলেন্সের ভাড়া প্রতি কিলোমিটার ১০ টাকা হারে নেওয়ার কথা থাকলেও সরকারি অ্যাম্বুলেন্সের চালক না থাকায় রোগীদের বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্সে যেতে হচ্ছে এবং অনেক ক্ষেত্রে অতিরিক্ত ভাড়া গুনতে হচ্ছে বলে অভিযোগ ভুক্তভোগীদের।
স্বপন হেমব্রমের মতো প্রতিদিনই নিম্নআয়ের বহু মানুষ জরুরি চিকিৎসার সময় অর্থসংকটে পড়ছেন। জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে থাকা একজন রোগীর জন্য অ্যাম্বুলেন্স কোনো বিলাসিতা নয়, এটি জরুরি চিকিৎসাসেবার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাই হাসপাতালে থাকা সরকারি অ্যাম্বুলেন্সটি দ্রুত সচল করা, যোগ্য চালক নিয়োগ এবং বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্সের ভাড়া নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগী ও স্থানীয়রা।
সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ লাঘবে বিষয়টি দ্রুত ও কঠোরভাবে নজরে নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন তারা।
এ বিষয়ে বিরামপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. সুব্রত কুমার সেন বলেন, সরকারি অ্যাম্বুলেন্সের চালক কামরুজ্জামান পারিবারিক একটি মামলার কারণে গত বছরের ডিসেম্বর মাস থেকে বরখাস্ত রয়েছেন। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। খুব দ্রুত বিকল্প একজন চালকের ব্যবস্থা করে সরকারি অ্যাম্বুলেন্সটি রোগীদের সেবায় চালু করার চেষ্টা করা হচ্ছে।
বরখাস্ত থাকা অবস্থায় ওই চালকের নিজস্ব অ্যাম্বুলেন্স উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চলাচলের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “বিষয়টি আমার জানা নেই। আমি বিষয়টি দেখব।”
বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্সের ভাড়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার সঙ্গে আলোচনা করে বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্সের জন্য একটি নির্ধারিত ভাড়া ঠিক করার উদ্যোগ নেওয়া হবে। খুব শিগগিরই তাদের সঙ্গে বসে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
মন্তব্য করুন