৩০ অগাস্ট ২০২৬, ৯:৫১ পূর্বাহ্ন
অনলাইন সংস্করণ

‘স্বাধীন বাংলাদেশে আর কোনো আয়নাঘর থাকবে না’

ডেস্ক নিউজ

‘গুমের ঘটনায় জড়িত অপরাধী যত বড় ক্ষমতাবানই হোক না কেন, তাদের বিচারের মুখোমুখি করা হবে এবং আইনের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।’

রোববার (৩০ আগস্ট) আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস উপলক্ষে বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে আয়োজিত অনুষ্ঠানে দেওয়া ভাষণে রাষ্ট্রপতি এসব কথা বলেন।

রাষ্ট্রপতি বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বে জোরপূর্বক গুমের শিকারদের গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন। একই সঙ্গে দিনের পর দিন, বছরের পর বছর নিখোঁজ স্বজনের অপেক্ষায় থাকা মা-বাবা, ভাই-বোন, স্ত্রী ও সন্তানদের প্রতিও সমবেদনা জানান তিনি।

রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘স্মরণ করছি সেই স্ত্রীকে, যিনি প্রিয় স্বামীকে হারিয়ে একা জীবনের কঠিন বাস্তবতার সঙ্গে লড়াই করে চলেছেন। স্মরণ করছি, সেই সন্তানকে, যার শৈশব পেরিয়ে গেছে বাবার ফিরে আসার অপেক্ষায়—কিন্তু বাবা তাকে কোলে তুলে নিতে আর ফিরে আসেননি।’

গুম কোনো সাধারণ অপরাধ নয়; এটি মানবতাবিরোধী অপরাধ। গুম শুধু একজন মানুষকে কেড়ে নেয় না, তার স্বজনদের হাসি, শান্তি, স্বপ্ন এবং অর্থনৈতিক ও সামাজিক স্বস্তিও কেড়ে নেয়। এটি জঘন্য মানবাধিকার লঙ্ঘন।

বাংলাদেশের সংবিধান প্রত্যেক নাগরিকের জীবন, ব্যক্তিস্বাধীনতা, আইনের সুরক্ষা ও মানবিক মর্যাদার নিশ্চয়তা দিয়েছে। গুম-খুনের মাধ্যমে এসব অধিকার একসঙ্গে লঙ্ঘন করা হয়।

বিগত দেড় দশকে গুম ও গোপন বন্দিশালা ‘আয়নাঘর’-এর ভয়াবহতা বাংলাদেশের ওপর চেপে বসেছিল উল্লেখ করে রাষ্ট্রপতি বলেন, অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, ভিন্নমত প্রকাশ কিংবা গণতান্ত্রিক অধিকার আদায়ের আন্দোলন করলেই অনেককে তুলে নিয়ে গুম করা হয়েছে এবং গোপনে হত্যা করা হয়েছে। অথচ তৎকালীন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো এসব গুরুতর অপরাধ অস্বীকার করে গেছে।

রাষ্ট্রপতি বিএনপির নেতা ইলিয়াস আলী, ওয়ার্ড কমিশনার চৌধুরী আলম, ওয়ার্ডের সাধারণ সম্পাদক সাজেদুল ইসলাম সুমনসহ গুমের শিকার অসংখ্য মানুষের কথা স্মরণ করেন। তিনি বলেন, তাঁদের পরিবারের প্রতিটি রাত এখনো বেদনা, অনিশ্চয়তা ও প্রতীক্ষার মধ্যে কাটছে।

See also  '৪৩৪১ হাজিকে ৪ কোটি ৮৭ লাখ টাকা ফেরত দেবে সরকার'

আইনজীবী ব্যারিস্টার আরমান, অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল আজমীসহ অসংখ্য ভিন্নমতাবলম্বী, কর্মকর্তা, লেখক, সাংবাদিক, সমাজকর্মী, গৃহবধূ ও সাধারণ নাগরিককে বছরের পর বছর অন্ধকার, স্যাঁতসেঁতে ও আলো-বাতাসহীন ‘আয়নাঘরে’ আটকে রাখা হয়েছিল বলেও উল্লেখ করেন তিনি। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদকেও গুম করে বিদেশে ফেলে আসা হয়েছিল বলে দাবি করেন রাষ্ট্রপতি। তাঁদের মধ্যে কেউ কেউ ফিরে এলেও এখনো বহু মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন বলে জানান তিনি।

১৯৭১ সালে মুক্তিযোদ্ধারা যে গণতন্ত্র, সাম্য, বাক্স্বাধীনতা, মানবিক মর্যাদা ও ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য জীবন দিয়েছিলেন, স্বাধীন বাংলাদেশে গুম-খুনের সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সেই আকাঙ্ক্ষার বিপরীতে ভয়াবহ ও ভীতিকর পরিবেশ তৈরি করা হয়েছিল। জাতীয় ইতিহাসে এটি অত্যন্ত বেদনাদায়ক ও অপমানজনক অধ্যায়।

বক্তব্যে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াকেও শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন রাষ্ট্রপতি। তিনি বলেন, ফ্যাসিবাদী সরকারের গুম-খুনের বিরুদ্ধে তিনি সব সময় সোচ্চার ছিলেন এবং বিশ্বাস করতেন, একদিন এসব গুম, খুন, অত্যাচার ও নির্যাতনের বিচার বাংলাদেশের মাটিতেই হবে।

বিএনপি, জামায়াতে ইসলামীসহ ফ্যাসিবাদবিরোধী রাজনৈতিক দল, সামাজিক শক্তি, গণমাধ্যম, সুশীল সমাজ ও সর্বস্তরের জনগণের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে রাষ্ট্রপতি বলেন, তাদের অনেকেই গুম-খুনের শিকার হয়েছেন। নিরস্ত্র ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মুখে ফ্যাসিবাদ দেশ থেকে পালাতে বাধ্য হয়েছে। এখন প্রতিশোধ নয়, প্রতিকারের ব্যবস্থা নিতে হবে এবং প্রকৃত অপরাধীদের আইনানুগ শাস্তির আওতায় আনতে হবে।

গুম-সংক্রান্ত তদন্ত কমিশনের চূড়ান্ত প্রতিবেদনের কথা উল্লেখ করে রাষ্ট্রপতি বলেন, কমিশন ১ হাজার ৫৬৯টি ঘটনাকে সুনির্দিষ্টভাবে গুম হিসেবে চিহ্নিত করেছে। এসব ঘটনার মধ্যে ২৮৭ জন নিখোঁজ ও মৃত। নির্বাচনের আগে গুমের ঘটনা বেড়ে যাওয়া এবং রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের নেতাকর্মীদের বেছে বেছে জোরপূর্বক গুম ও গোপনে হত্যার চিত্র প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। রাষ্ট্রক্ষমতা কুক্ষিগত করে রাখতেই দলীয় ও ব্যক্তিস্বার্থে এসব বর্বর কর্মকাণ্ড করা হয়েছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।

তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদন একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি তৈরি করেছে, তবে পথ এখনো অনেক দীর্ঘ। এবারের আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবসের প্রতিপাদ্য ‘Victims first, Action now’ (ভিক্টিম ফাস্ট, এক্শন নাও)। গুমের শিকার ব্যক্তি ও তাদের পরিবারকে সুরক্ষা দেওয়া এবং গুমকে চিরতরে নিষিদ্ধ করতে ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল, ২০২৬’ জাতীয় সংসদে উত্থাপিত হয়েছে।

See also  আওয়ামী লীগ রাজনৈতিক দল নয়, বরং ‘মাফিয়া গ্যাং’: ডা. জাহেদ

বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ সনদে স্বাক্ষর করেছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে গুম ও গণহত্যার বিচার স্বচ্ছতা ও আন্তর্জাতিক মানদণ্ড বজায় রেখে এগিয়ে চলছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

রাষ্ট্রপতি বলেন, এমন একটি বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করতে হবে, যেখানে রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকবে, কিন্তু রাজনৈতিক প্রতিহিংসা থাকবে না; মতপ্রকাশের স্বাধীনতা থাকবে, কিন্তু ভয়ের সংস্কৃতি থাকবে না। আইনশৃঙ্খলা থাকবে, তবে আইনের নামে মানবাধিকার ও সুবিচার লঙ্ঘনের সুযোগ থাকবে না। রাষ্ট্রের ক্ষমতার ওপর সংবিধান ও আইনের নিয়ন্ত্রণ থাকবে।

আমি আজ বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হিসেবে আপনাদের সামনে দাঁড়িয়ে স্পষ্ট ভাষায় বলতে চাই, এই স্বাধীন বাংলাদেশে আর কোনো আয়নাঘর থাকবে না।’ কোনো মাকে সন্তানের জন্য কিংবা কোনো স্ত্রীকে স্বামীর জন্য চোখের পানি ফেলতে হবে না বলেও প্রত্যয় ব্যক্ত করেন তিনি।

গুমের সঙ্গে জড়িতদের বিচারের প্রতিশ্রুতি দিয়ে রাষ্ট্রপতি বলেন, অপরাধী যত বড় ক্ষমতাবানই হোক না কেন, তাকে বিচারের মুখোমুখি করা হবে। আইনের সর্বোচ্চ শাস্তি তাদের পেতেই হবে। দেশে ফ্যাসিবাদ ফিরে আসার সব পথ চিরতরে বন্ধ করা হবে বলেও তিনি ঘোষণা দেন।

গুমের শিকার পরিবারগুলোর পাশে আন্তরিকভাবে দাঁড়ানো রাষ্ট্রের পবিত্র দায়িত্ব উল্লেখ করে রাষ্ট্রপতি আশা প্রকাশ করেন, সরকার এ বিষয়ে উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।

গণতন্ত্র, মানবাধিকার, সাম্য ও মর্যাদাকে রাষ্ট্রের ভিত্তি, সুশাসনকে রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি, জবাবদিহি ও বাক্স্বাধীনতাকে গণতন্ত্রের শক্তি এবং ইনসাফকে প্রতিটি নাগরিকের অধিকার হিসেবে প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানান রাষ্ট্রপতি। গুম ও বিচারহীনতার অন্ধকার পেরিয়ে বাংলাদেশ সত্য, ন্যায় ও মানবিকতার পথে এগিয়ে যাবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

Facebook Comments Box

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

নবাব ফয়জুন্নেছাকে স্মরণ নিয়ে ইতিহাসের তথ্য যাচাইয়ের আহ্বান

কুমিল্লায় ট্যাপেন্টাডলসহ গ্রেপ্তার ১, ছিনতাইকারী ১৪

চৌদ্দগ্রামে শহীদ হাজী সুরুজ মিয়া স্মৃতি গোল্ডকাপ টুর্নামেন্ট-২০২৬ইং অনুষ্ঠিত

শার্শা থানা পুলিশের অভিযানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের দুই নেতাকে আটক

বুড়িচংয়ে ‘মানবতা’ সংগঠনের উদ্যোগে শিক্ষার্থীদের মাঝে সুপারি গাছের চারা ও শিক্ষা উপকরণ বিতরণ

নিখোঁজ অটোচালকের গলিত মরদেহ উদ্ধার 

কুমিল্লা জেলা পুলিশের মাসিক কল্যান সভায় জেলায় শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করেছে দাউদকান্দি সার্কেল ও অফিসার ইনচার্জ

কুমিল্লায় কৃষি ও মৎস্য-প্রাণিসম্পদমন্ত্রীর মায়ের জানাজা অনুষ্ঠিত

সংসদে নতুন দায়িত্বে হুইপ দুলু

ভোলার গ্যাস পাইপলাইনে মূল ভূখণ্ডে নিতে ৭ বছর লাগবে: প্রধানমন্ত্রী

১০

প্রধানমন্ত্রীর প্রশংসা করলেন এমপি হানজালা

১১

ইউটিউবে ১০০ কোটি ভিউয়ের রেকর্ড গড়ল ‘পাসুরি’

১২

বেলুচিস্তানে নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযানে ১১ সন্ত্রাসী নিহত

১৩

বিএনপিকে আওয়ামী লীগের সঙ্গে তুলনা করতে চাই না: সারজিস

১৪

ফ্যাসিস্টের হাত থেকে মুক্তি পেতে অনেক বেশি মূল্য দিয়েছি: রাষ্ট্রপতি

১৫

হাম ও উপসর্গে মৃত্যু হাজার ছাড়াল

১৬

ছাত্রদের দেশের জন্য কাজ করতে হবে, তবে লেখাপড়া ছেড়ে নয়

১৭

বাংলাদেশ থেকে ১০ হাজার কৃষক ও মৎস্যজীবী নেবে ওমান: শামা ওবায়েদ

১৮

রাষ্ট্রপতি-প্রধানমন্ত্রী পদের আগে ‘মহামান্য’ ও ‘মাননীয়’ ব্যবহার না করার অনুরোধ

১৯

শেখ হাসিনার ফুফাতো ভাইয়ের ফাঁসি চাইলেন ছাত্রদল নেতা টিপুর স্ত্রী

২০