“পৃথিবী সবার প্রয়োজন মেটাতে পারে, কিন্তু মানুষের লোভ মেটাতে পারে না।” — মহাত্মা গান্ধী
মানুষের সীমাহীন লোভ, শিল্পায়ন আর নগরায়ণের অন্ধ দৌড়ে আজ আমাদের এই চেনা পৃথিবী জলবায়ু পরিবর্তন ও বৈশ্বিক উষ্ণায়নের চরম ঝুঁকিতে নিমজ্জিত। সবুজ বনাঞ্চল কেটে গড়ে উঠছে ইটের পর ইট, ধূসর হচ্ছে চারপাশ। যখন অধিকাংশ মানুষ নিজের স্বার্থ, ক্যারিয়ার আর বিলাসী জীবনের পেছনে অন্ধের মতো ছুটছে, ঠিক তখনই কিছু বিরল ব্যক্তিত্ব নিঃস্বার্থভাবে কাজ করে যাচ্ছেন আগামী প্রজন্মের জন্য একটি বাসযোগ্য ও নিরাপদ পৃথিবী রেখে যেতে। এমনই একজন সবুজ স্বপ্নের ফেরিওয়ালা হলেন প্রকৌশলী টুটুল। পেশাগত জীবনে তিনি একজন সফল স্থপতি ও প্রকৌশলী হলেও, তাঁর মূল এবং সবচেয়ে বড় পরিচয় হলো—তিনি একজন ‘গাছপাগল’ মানুষ। বিগত ৩২ বছর ধরে তিনি নিজের মেধা, শ্রম ও উপার্জনের সিংহভাগ বিলিয়ে দিয়েছেন সবুজের প্রসারে। তিনি এমন এক অভিযাত্রী, যিনি নিঃশব্দে এক মহাবিপ্লব ঘটিয়ে চলেছেন।
১৯৯৫ সালে চাকুরিজীবনে প্রবেশের পর থেকেই ইঞ্জিনিয়ার টুটুলের এই অনন্য ও অবিস্মরণীয় যাত্রার শুরু। আজ থেকে প্রায় তিন দশক আগে, যখন পরিবেশ বিপর্যয় বা বৈশ্বিক উষ্ণায়ন নিয়ে বর্তমানের মতো দেশব্যাপী এত আলোচনা কিংবা সচেতনতা ছিল না, যখন বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি আজকের মতো জনপ্রিয় হয়ে ওঠেনি; তখনই এই তরুণ প্রকৌশলী অনুধাবন করেছিলেন প্রকৃতির এই মহাসংকট। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় থেকেই তিনি পরিবেশ বিষয়ক বিভিন্ন বই ও প্রবন্ধ পড়তেন। সেখান থেকেই জানতে পেরেছিলেন মানুষের নির্মম কুঠারে কীভাবে ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে পৃথিবীর ফুসফুস খ্যাত আমাজনসহ লাখ লাখ একর বনাঞ্চল। প্রকৃতির এই আর্তনাদ তাঁর তরুণ হৃদয়কে গভীরভাবে আলোড়িত করেছিল। সেদিনই তিনি নিজের বিবেকের কাছে একটি পবিত্র প্রতিজ্ঞা করেছিলেন—”সবাই যদি গাছ কাটে, আমি অন্তত গাছ লাগাব। সবাই যদি নীরব থাকে, আমি অন্তত মানুষকে সচেতন করব।” সেই একক প্রতিজ্ঞাই আজ তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় চালিকাশক্তি।
কোনো মহৎ এবং দীর্ঘমেয়াদী কাজই মসৃণ বা সহজ পথে অর্জিত হয় না। ইঞ্জিনিয়ার টুটুলের এই সবুজ বিপ্লবের পেছনে রয়েছে এক দীর্ঘ আত্মত্যাগ ও নীরব সংগ্রামের গল্প। সরকারি চাকুরির দিনভর কঠোর দায়িত্ব পালন করার পর যখন অন্যেরা বিশ্রামে মগ্ন হতেন, আড্ডায় মেতে উঠতেন; তখন শুরু হতো টুটুল সাহেবের রাতের যুদ্ধ। রাতভর জেগে তিনি বিভিন্ন ব্যক্তিমালিকানাধীন বা বেসরকারি বাড়ির নকশা ও স্থাপত্য ডিজাইনের কাজ করতেন। এই অতিরিক্ত পরিশ্রম থেকে যে অর্থ উপার্জন হতো, তার প্রায় পুরোটাই তিনি জমা রাখতেন গাছের চারা কেনার তহবিলে। নিজের জন্য নতুন পোশাক কেনা, ভালো রেস্তোরাঁয় খাওয়া বা বিলাসিতার কোনো সামগ্রী কেনার আগে তিনি হিসাব করতেন—”এই টাকায় আরও কতগুলো চারাগাছ কেনা সম্ভব?” অনেক সময় এমনও কঠিন পরিস্থিতি হয়েছে, যখন গাছের চারা কিনতে গিয়ে তাঁর সংসারের নিত্যদিনের বাজার করার টাকাও শেষ হয়ে গেছে। কিন্তু কোনো অভাব, কোনো সামাজিক উদাসীনতা তাঁর এই পরম নেশা ও সাধনাকে থামিয়ে রাখতে পারেনি।
ইঞ্জিনিয়ার টুটুল শুধু বিনামূল্যে গাছের চারা বিতরণ করেই তাঁর দায়িত্ব শেষ করেননি; তিনি মূলত শিশুদের মনের মণিকোঠায় রোপণ করেছেন ভবিষ্যতের আশা ও পরিবেশ সচেতনতার বীজ। চারা বিতরণের জন্য তিনি বেছে নিতেন গ্রামের প্রাথমিক স্কুল থেকে শুরু করে শহরের নামী-দামী কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়। কোমলমতি শিক্ষার্থীদের সামনে দাঁড়িয়ে তিনি অত্যন্ত সহজ ও জাদুকরী ভাষায় বলতেন—”গাছ আমাদের বিনা মূল্যে অক্সিজেন দেয়, মেঘ ডেকে বৃষ্টি আনে। গাছ না থাকলে আমাদের নদীগুলো শুকিয়ে যাবে, চৈত্র মাসে ফসল হবে না, আর পুরো পৃথিবী একদিন মরুভূমি হয়ে যাবে। জীবনের কঠিনতম সময়ে একটি বড় গাছই হতে পারে তোমার পরিবারের সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক সম্বল। তাই আজ একটি গাছ লাগাও, আগামী প্রজন্মকে একটি সুন্দর পৃথিবী উপহার দাও।”
তাঁর এই ভালোবাসাপূর্ণ বাণী শিশুদের ভীষণভাবে উদ্বুদ্ধ করত। তারা পরম আনন্দে চারাগুলো বুকে জড়িয়ে বাড়ি ফিরত এবং নিজেদের আঙিনায় রোপণ করত। বছরের পর বছর পেরিয়ে সেই শিশুরা যখন বড় হয়ে, নিজের গাছের প্রথম ফলটি পেড়ে নিয়ে টুটুল সাহেবের সামনে এসে দাঁড়াত আর বলত—”স্যার, এটা আপনার দেওয়া গাছের প্রথম ফল”; তখন প্রবীণ এই স্বপ্নদ্রষ্টার চোখের কোণে আনন্দের জল টলমল করে উঠত। এই একটি মুহূর্তই যেন তাঁর জীবনের সমস্ত রাত জাগা ক্লান্তি ও ত্যাগকে শ্রেষ্ঠ পুরস্কারে ভূষিত করত।
সময়ের নিয়মে আজ ইঞ্জিনিয়ার টুটুলের বয়স বেড়েছে। শরীর আগের মতো চটপটে ও শক্তিশালী নয়, বার্ধক্যের ছাপ পড়েছে অবয়বে। কিন্তু তাঁর ভেতরের সবুজ স্বপ্নটি এখনো চিরতরুণ, চিরসবুজ। বাবার এই মহৎ কর্মযজ্ঞকে বাঁচিয়ে রাখতে এবং আরও বেগবান করতে এখন তাঁর পাশে এসে দাঁড়িয়েছে তাঁর যোগ্য সন্তান সাকিব। বাবা-ছেলে যখনই পেশাগত কারণে দেশের বিভিন্ন জেলা ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে ভবনের নকশা করতে যান, তাঁদের গাড়ির পেছনে নকশার কাগজের সাথে পরম যত্নে রাখা থাকে একঝাঁক চারাগাছ। কাজ শেষে তাঁরা কাছাকাছি কোনো স্কুল খুঁজে বের করেন এবং শিশুদের হাতে তুলে দেন আগামীর সবুজ পৃথিবীর আমানত।
বিগত ৩২ বছরে দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ছুটে বেড়িয়ে তিনি নিজ হাতে ও ব্যক্তিগত উদ্যোগে প্রায় ১১ থেকে ১২ লক্ষ গাছের চারা রোপণ ও বিতরণ করেছেন। তবে তাঁর এই মহৎ অভিযাত্রা এখানেই শেষ নয়। তিনি বুক ভরা আশা নিয়ে ঘোষণা করেছেন—”আমি জীবিত অবস্থায় ২০ লক্ষ গাছের চারা রোপণ ও বিতরণ করব, ইনশাআল্লাহ।”
বর্তমান সময়ে সরকারি, বেসরকারি ও বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের উদ্যোগে বৃক্ষরোপণ একটি জাতীয় মহোৎসবে পরিণত হয়েছে। চারিদিকের এই সবুজ উদ্যোগ দেখে প্রবীণ এই বৃক্ষপ্রেমিকের বুক শান্তিতে ভরে ওঠে। তিনি কখনো কোনো রাষ্ট্রীয় পুরস্কার, সম্মাননা, পদক কিংবা সস্তা প্রচারের আশায় এই কাজ করেননি। তিনি এক গভীর আধ্যাত্মিক ও মানবিক দর্শন নিয়ে কাজ করেন। তিনি বিশ্বাস করেন—মানুষ নশ্বর, একদিন সবাই চলে যাবে; কিন্তু একটি বৃক্ষ শত বছর ধরে পৃথিবীর বুকে বেঁচে থেকে মানবজাতিসহ সমস্ত জীবকুলকে ছায়া, ফল আর অক্সিজেন দিয়ে যাবে। এর চেয়ে বড় পরোপকার আর কী হতে পারে!
ইঞ্জিনীয়ার টুটুল আজ সকলের কাছে শুধু একটি দোয়াই চান, যেন জীবনের শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত তিনি একটি করে চারা রোপণ করে যেতে পারেন। হয়তো কালের নিয়মে একদিন মানুষ তাঁর নাম ভুলে যাবে, ইতিহাসের পাতায় তাঁর নাম লেখা থাকবে না। কিন্তু বাংলাদেশের আনাচে-কানাচে, স্কুল-কলেজের মাঠে ও গ্রামীণ জনপদে বেড়ে ওঠা লক্ষ লক্ষ বৃক্ষের পাতার মর্মর ধ্বনি আর বাতাসের দোলা আগামী প্রজন্মকে ফিসফিস করে বলে যাবে—এই বাংলায় একজন মানুষ ছিলেন, যিনি নিজের বৈষয়িক সুখের চেয়ে এই পৃথিবীর সবুজকে অনেক বেশি ভালোবেসেছিলেন; যিনি নিজ হাতে বুনেছিলেন বিশ লক্ষ সবুজ স্বপ্নের বীজ।
মোঃ সাইফুল্লাহ
কলামিস্ট
saiful647171932@gmail.com
মন্তব্য করুন