আন্তর্জাতিক ডেস্ক
ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের অত্যাধুনিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধব্যবস্থার মজুত কমে যাওয়ার উদ্বেগের মধ্যে অস্ত্র উৎপাদন বাড়াতে প্রতিরক্ষা কোম্পানিগুলোর ওপর চাপ বাড়িয়েছে পেন্টাগন। কমে যাওয়া গোলাবারুদের মজুত দ্রুত পূরণ করতে উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি সরবরাহের সময়ও উল্লেখযোগ্যভাবে কমানোর উদ্যোগ নিয়েছে মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর।
বাংলাদেশ সময় রোববার (৯ আগস্ট) পেন্টাগনের মুখপাত্র শন পারনেল এক বিবৃতিতে বলেন, যুদ্ধক্ষেত্রে থাকা মার্কিন সেনাদের প্রয়োজনীয় অস্ত্র ‘হুমকির গতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে’ সরবরাহ করতে গোলাবারুদ সংগ্রহ বাড়ানোর দিকে দপ্তরটি সক্রিয়ভাবে মনোযোগ দিচ্ছে।
গত এক সপ্তাহে এই প্রক্রিয়া উল্লেখযোগ্যভাবে দ্রুত করার জন্য যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, সেটিও তিনি নিশ্চিত করেন। তবে তার দাবি, এটি শুধু পাঁচ মাস ধরে চলা ইরান যুদ্ধের কারণে নেওয়া কোনো তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ নয়; বরং এর অংশ হিসেবে আগে থেকেই চলমান বৃহত্তর সামরিক আধুনিকায়ন কার্যক্রমেরই একটি অংশ।
এর মধ্যেই বুধবার প্রতিরক্ষা শিল্পের শীর্ষ কর্মকর্তাদের কাছে একটি চিঠি পাঠান মার্কিন উপপ্রতিরক্ষামন্ত্রী স্টিভ ফেইনবার্গ। দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট যে স্মারকলিপিটি পেয়েছে, তাতে গুরুত্বপূর্ণ সামরিক সক্ষমতার উৎপাদন বাড়ানো এবং সরবরাহের সময় উল্লেখযোগ্যভাবে কমানোর পরিকল্পনা জমা দিতে কোম্পানিগুলোকে সর্বোচ্চ ২১ দিন সময় দেওয়া হয়েছে।
স্মারকলিপিতে ফেইনবার্গ বলেন, গুরুত্বপূর্ণ সামরিক সক্ষমতার ক্ষেত্রে ‘আরও দ্রুত ও আগ্রাসী সরবরাহের সময়সূচি’ বাস্তবায়ন করতে হবে এবং উৎপাদন বাড়াতে হবে। তার ভাষায়, বছরের পর বছর ধরে চলা উন্নয়ন প্রক্রিয়া গ্রহণযোগ্য নয়। এখনই কর্মসূচির সময়সূচি নাটকীয়ভাবে দ্রুত করার পাশাপাশি উৎপাদন সক্ষমতা বাড়াতে হবে।
পেন্টাগনের এই তৎপরতা এমন সময়ে সামনে এলো, যখন ইরানের সঙ্গে সাম্প্রতিক লড়াইয়ে যুক্তরাষ্ট্রের আগে থেকেই কমে যাওয়া অত্যাধুনিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধী অস্ত্রের মজুত আরও কমেছে। নতুন এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, যুদ্ধ আবার শুরু হলে এই পরিস্থিতি মার্কিন সেনাদের ঝুঁকির মধ্যে ফেলতে পারে।
ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ বা সিএসআইএসের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, প্যাট্রিয়ট ও থাড (THAAD) ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধী ব্যবস্থার মজুত উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়ায় যুক্তরাষ্ট্র ও মধ্যপ্রাচ্যে তার মিত্রদের বিমান প্রতিরক্ষার এসব অস্ত্র ব্যবহারে আরও ঝুঁকি নিতে হতে পারে।
বিশ্লেষণে একটি সম্ভাব্য পরিস্থিতির কথাও বলা হয়েছে। মার্কিন বাহিনী ইরান থেকে ছোড়া ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্রের বিরুদ্ধে কম সংখ্যক প্রতিরোধী ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়তে পারে, যাতে সীমিত মজুত দ্রুত শেষ হয়ে না যায়। এর ফলে ইরানের ছোড়া কোনো ড্রোন বা ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ভেদ করে যাওয়ার আশঙ্কা বেড়ে যেতে পারে।
এদিকে অস্ত্রের মজুত কমে যাওয়ার খবর প্রকাশ্যে আসার পর সাম্প্রতিক দিনগুলোতে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। বৃহস্পতিবার তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ‘বিপুল পরিমাণ’ অস্ত্র থাকার দাবি করেন। একই সঙ্গে তিনি বলেন, প্রয়োজন অনুযায়ী বিপুল পরিমাণ অস্ত্র তৈরি ও যুক্তরাষ্ট্রে পাঠানো হচ্ছে।
শনিবার পেন্টাগনের মুখপাত্র শন পারনেল নিশ্চিত করেন, ফেইনবার্গের দ্রুত অস্ত্র উৎপাদন বাড়ানোর নির্দেশসংবলিত স্মারকলিপিটি সত্যি। তিনি বলেন, এই উদ্যোগ ২০২৮ অর্থবছরের জন্য কংগ্রেসে জমা দেওয়ার বাজেট প্রস্তাবে প্রভাব ফেলবে। তার ভাষায়, এটি মার্কিন প্রতিরক্ষা শিল্পভিত্তি পুনর্গঠনের চলমান প্রচেষ্টার সঙ্গেও পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ।
তবে অস্ত্র উৎপাদন বাড়ানোর এই উদ্যোগের সামনে অর্থায়নের প্রশ্নও বড় হয়ে দেখা দিয়েছে। বর্তমানে মার্কিন কংগ্রেসে একটি প্রতিরক্ষা ব্যয় বিল আটকে আছে। ইরানের বিরুদ্ধে ট্রাম্পের সামরিক পদক্ষেপ নিয়ে আইনপ্রণেতাদের মধ্যে অসন্তোষ রয়েছে। একই সঙ্গে হোয়াইট হাউজ পেন্টাগনের ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে ১ দশমিক ৫ ট্রিলিয়ন ডলারে নেওয়ার যে অনুরোধ করেছে, সেটির বিরোধিতাও করছেন তাঁরা। গত বছর পেন্টাগনের ব্যয় ছিল প্রায় ৯০০ বিলিয়ন ডলার।
সিএসআইএসের হিসাব অনুযায়ী, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ শুরুর আগে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধী ব্যবস্থার সংখ্যা ছিল ২ হাজার ৩৩০টি। গত এপ্রিলের যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার সময় সেই সংখ্যা কমে দাঁড়ায় ১ হাজার ৩০টিতে।
তবে পরবর্তী সময়ে ইরানের সঙ্গে নতুন করে লড়াই হওয়ায় মজুত আরও কমেছে। গত মাসে সিএসআইএসের করা হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের প্যাট্রিয়ট প্রতিরোধী ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত ৭৫৯ থেকে ৮২৭টির মধ্যে রয়েছে। অর্থাৎ যুদ্ধ শুরুর আগের অবস্থার তুলনায় মজুত কমেছে অন্তত ৬৫ শতাংশ।
থাড ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধী ব্যবস্থার ক্ষেত্রেও একই ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে। সিএসআইএস জানিয়েছে, যুদ্ধ শুরুর আগে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ৪৫২টি থাড প্রতিরোধী ক্ষেপণাস্ত্র ছিল। গত এপ্রিলের যুদ্ধবিরতির শুরুতে সেই সংখ্যা কমে ২৩২ থেকে ২৬২টির মধ্যে নেমে আসে।
এরপর যুক্তরাষ্ট্র কিছু থাড ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত আবার পূরণ করতে সক্ষম হয়। ফলে সংখ্যা বেড়ে ২৩৪ থেকে ২৭৮টির মধ্যে দাঁড়ায়। কিন্তু পুনরায় মজুত বাড়ানোর পরও যুদ্ধ শুরুর আগের তুলনায় থাড প্রতিরোধী ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত এখনো অন্তত ৩৮ শতাংশ কম।
এই পরিস্থিতিতে পেন্টাগনের সামনে এখন দুটি বড় চ্যালেঞ্জ- একদিকে ইরানের সঙ্গে সংঘাতের কারণে কমে যাওয়া অত্যাধুনিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধী অস্ত্রের মজুত দ্রুত পূরণ করা, অন্যদিকে দীর্ঘমেয়াদি প্রতিরক্ষা শিল্প সক্ষমতা বাড়ানো। ফেইনবার্গের ২১ দিনের সময়সীমা এবং দ্রুত উৎপাদন বাড়ানোর নির্দেশ থেকে বোঝা যাচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্র তার প্রতিরক্ষা শিল্পকে প্রচলিত দীর্ঘমেয়াদি উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থার বাইরে গিয়ে দ্রুত সক্ষমতা বাড়ানোর দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
মন্তব্য করুন