ডেস্ক নিউজ
বাংলাদেশের মানবাধিকার সুরক্ষা ব্যবস্থাকে দুর্বল করেছে সেপ্টেম্বরে জাতীয় সংসদে পাস হওয়া তিনটি আইন—এমন দাবি করেছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ)। সংস্থাটির মতে, এসব আইনের মাধ্যমে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় নেওয়া কিছু সুরক্ষা ব্যবস্থা বাতিল বা সীমিত করা হয়েছে। ফলে গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের মতো অতীতের মানবাধিকার লঙ্ঘনের পুনরাবৃত্তি ঠেকানোর সক্ষমতা কমতে পারে।
এইচআরডব্লিউ বলেছে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে (এনএইচআরসি) শক্তিশালী করতে দুটি অধ্যাদেশ জারি করেছিল। এর আওতায় নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযোগ তদন্ত, গুম প্রতিরোধ এবং আটককেন্দ্র পরিদর্শনের মতো ক্ষমতা দেওয়া হয়েছিল।
তবে সেপ্টেম্বরে পাস হওয়া নতুন এনএইচআরসি আইনে কমিশনের সরাসরি তদন্তের ক্ষমতা সীমিত করা হয়েছে বলে দাবি করেছে সংস্থাটি। কোনো আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে সংশ্লিষ্ট বাহিনীকে প্রতিবেদন দিতে বলা যাবে। তবে ওই প্রতিবেদন সন্তোষজনক না হলে বা প্রতিবেদন না দিলে কমিশনের নিজস্ব তদন্তের সুযোগ রয়েছে বলে আইনে উল্লেখ আছে।
এইচআরডব্লিউর মতে, নতুন আইনে কমিশনার নিয়োগ প্রক্রিয়ায় সরকারের প্রভাব বাড়ানো এবং কমিশনের বাজেট ও প্রশাসনিক স্বাধীনতা কমানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে।
৬ সেপ্টেম্বর জাতীয় সংসদে পাস হওয়া জোরপূর্বক গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন নিয়েও আপত্তি জানিয়েছে এইচআরডব্লিউ।
সংস্থাটির দাবি, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধ্যাদেশে গুমের অভিযোগ তদন্তের ক্ষমতা এনএইচআরসিকে দেওয়া হলেও নতুন আইনে সেই দায়িত্ব আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর দেওয়া হয়েছে। অভিযুক্ত বাহিনীকে বাদ দিয়ে অন্য কোনো নিরাপত্তা সংস্থা বা আন্তঃসংস্থা তদন্ত দলের মাধ্যমে তদন্তের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
এ ছাড়া আটককেন্দ্র, এমনকি গোপন আটককেন্দ্রের সন্দেহ থাকলেও সেগুলো পর্যবেক্ষণ ও পরিদর্শনের যে ক্ষমতা আগের অধ্যাদেশে কমিশনকে দেওয়া হয়েছিল, নতুন আইনে তা আর নেই বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।
গুমের ঘটনায় কমান্ড রেসপনসিবিলিটির আইনি মানদণ্ডও পরিবর্তন করা হয়েছে বলে এইচআরডব্লিউ জানিয়েছে। আগের ব্যবস্থায় কোনো কর্মকর্তা কোনো লঙ্ঘনের বিষয়ে জানতেন বা জানা উচিত ছিল এবং তা প্রতিরোধ করতে পারতেন—এমন পরিস্থিতিতেও দায় নির্ধারণের সুযোগ ছিল। নতুন ব্যবস্থায় সরাসরি নির্দেশ দেওয়ার প্রমাণ প্রয়োজন হবে বলে দাবি করেছে সংস্থাটি।
১০ সেপ্টেম্বর সংসদে স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন আইন পাস করে র্যাবের নাম পরিবর্তন করে স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) করা হয়েছে। ১৬ সেপ্টেম্বর থেকে নতুন নামে বাহিনীটির কার্যক্রম শুরু হয়েছে বলে এইচআরডব্লিউ জানিয়েছে।
সংস্থাটির দাবি, র্যাবের জনবল, ক্ষমতা ও সম্পদ, এমনকি নথিপত্রও নতুন বাহিনীতে হস্তান্তর করা হয়েছে। বাহিনীটির লোগোও একই রাখা হয়েছে, শুধু ‘RAB’-এর পরিবর্তে ‘SRB’ লেখা হয়েছে।
এইচআরডব্লিউ বলছে, নতুন আইনে নিরাপত্তা বাহিনীর জন্য পর্যাপ্ত মানবাধিকার সুরক্ষা, প্রশিক্ষণ, স্বাধীন তদারকি ও জবাবদিহির ব্যবস্থা রাখা হয়নি।
এইচআরডব্লিউর এশিয়া বিষয়ক পরিচালক এলেইন পিয়ারসন বলেন, অতীতের গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে বাংলাদেশের নিরাপত্তা খাতে প্রকৃত সংস্কার এবং নির্যাতনের অভিযোগ তদন্তের পূর্ণ ক্ষমতাসম্পন্ন একটি স্বাধীন মানবাধিকার সংস্থা প্রয়োজন।
তার মতে, নিরাপত্তা বাহিনীকে কার্যকর তদারকি ও জবাবদিহির বাইরে রাখার উদ্যোগ মানুষের আস্থা তৈরিতে সহায়ক নয়।
তবে সরকারের পক্ষ থেকে এনএইচআরসি আইনকে মানবাধিকার সুরক্ষা জোরদারের উদ্যোগ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান সংসদে বলেছেন, নতুন আইনে কমিশনকে আরও কার্যকর ও স্বাধীন করার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
মন্তব্য করুন