মোঃ ইব্রাহীম মিঞা, দিনাজপুর প্রতিনিধি:
এক মাঠে ফুটবল, গ্যালারিতে শিশু থেকে প্রবীণ—কেউ খেলোয়াড়, কেউ দর্শক। মাঠের পাশে মায়েরা, বোনেরা, স্ত্রী, খালা, দাদি আর পরিবারের অন্য সদস্যদের সরব উপস্থিতি। খেলা শেষে আবার সবাই মিলে একই আয়োজনে খাবার গ্রহণ। যেন একটি ফুটবল টুর্নামেন্ট নয়, পুরো গ্রামই একদিনের জন্য পরিণত হয়েছিল এক বড় পরিবারে।
দিনাজপুরের বিরামপুর উপজেলার দওলাপাড়া ফুটবল মাঠে শনিবার (২৬ সেপ্টেম্বর) অনুষ্ঠিত হয়েছে ‘সারাদিনব্যাপী এক ব্যতিক্রমধর্মী ফুটবল টুর্ণামেন্ট-২০২৬’-এর দ্বিতীয় আসর। সকাল ১০টা থেকে শুরু হয়ে দিনব্যাপী এ আয়োজন ঘিরে দওলাপাড়া এলাকায় তৈরি হয় উৎসবমুখর পরিবেশ।
দওলাপাড়া গ্রামবাসীর আয়োজনে এবং জেড.এম. ইন্টারন্যাশনাল স্কুল, শালবাগান, বিরামপুরের সৌজন্যে আয়োজিত এ টুর্নামেন্টে অংশ নেয় গ্রামের বিভিন্ন বয়স ও শ্রেণির খেলোয়াড়দের নিয়ে গঠিত একাধিক দল। মাঠে দেখা যায় সিনিয়র কোবরা, টিম লায়ন্স, নাইট কিংস, টিম টাইগার্স, ডার্ক হর্স, সিনিয়র পাইথন, জুনিয়র কোবরা, জুনিয়র পাইথন, দওলাপাড়া ওরিয়স, দওলাপাড়া ভাইপার ও দওলাপাড়া স্পেশাল টিমসহ বিভিন্ন দলকে। পাশাপাশি ছিল শিশুদের অংশগ্রহণ এবং বিশেষ আকর্ষণ ‘ষাট ঊর্ধ্ব বয়স্কদের দল’।
তবে এই আয়োজনের ব্যতিক্রমী দিক শুধু মাঠের খেলায় নয়; বরং একটি গ্রামের সর্বস্তরের মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণই এ টুর্নামেন্টকে দিয়েছে ভিন্ন মাত্রা।
আয়োজকদের পরিকল্পনায় একই মাঠে প্রজন্মের পর প্রজন্মকে খেলাধুলার সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। প্রবীণরা যেমন মাঠে নেমেছেন, তেমনি খেলেছেন তরুণ ও নবীনরা। অংশ নিয়েছে শিশুরাও। ফলে এক মাঠেই দেখা গেছে বিভিন্ন বয়সের মানুষের মিলনমেলা।
আর দর্শকসারিতেও ছিল একই চিত্র। গ্রামের এমন কোনো পরিবার যেন ছিল না, যাদের কেউ না কেউ এ আয়োজনে যুক্ত ছিলেন না। কেউ খেলেছেন, কেউ মাঠে বসে খেলা দেখেছেন। পরিবারের পুরুষ সদস্যদের পাশাপাশি মা-বোন, স্ত্রী, খালা, দাদি ও শিশুরাও ছিলেন দর্শক। মাঠের চারপাশে তাদের উপস্থিতি পুরো আয়োজনকে পরিণত করে পারিবারিক উৎসবে।
দিনভর বিভিন্ন দলের প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ম্যাচ শেষে আয়োজনের আরেকটি ব্যতিক্রমী পর্ব ছিল খাবারের আয়োজন। পুরস্কার বিতরণের আগে অংশগ্রহণকারী ও উপস্থিতদের জন্য মাংস ও খিচুড়ির আয়োজন করা হয়। সবাই একসঙ্গে খাবার গ্রহণের পর অনুষ্ঠিত হয় পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠান। ফলে খেলাধুলার প্রতিযোগিতার পাশাপাশি তৈরি হয় পারস্পরিক সৌহার্দ্য, ভ্রাতৃত্ব ও আনন্দ ভাগাভাগির পরিবেশ।
টুর্নামেন্টে ধারাভাষ্যকার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন উত্তরবঙ্গের জনপ্রিয় ধারাভাষ্যকার আসাদুজ্জামান আসাদ। তাঁর প্রাণবন্ত ধারাভাষ্যে মাঠের উত্তেজনা ও দর্শকদের উচ্ছ্বাস আরও প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে।আর পুরো আয়োজনটি সারাবিশ্বে তুলে ধরতে লাইভ সম্প্রচারে ছিলেন Birampur Sports Zone ফেসবুক পেজের এডমিন টিমন মার্ডি।
অনুষ্ঠানে অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিরামপুর উপজেলা যুবদলের সদস্যসচিব অ্যাডভোকেট মিয়া মো. শিরণ আলম, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর পৌর শাখার আমি মামুনুর রশিদ, পৌর সেক্রেটারি ইঞ্জিনিয়ার শাহিনুর ইসলাম, বিরামপুর পৌর যুবদলের সদস্যসচিব পলাশ বিন আশরাফী এবং পলিপ্রয়াগপুর ইউনিয়নের ইউপি সদস্য পলাশ চন্দ্র কুমার সরকার,বিরামপুর সৌখিন ইলেকট্রনিক্স এর স্বত্তাধিকারীসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দ, সামাজিক ব্যক্তিত্ব, স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তি ও ক্রীড়াপ্রেমীরা উপস্থিত ছিলেন।
আমন্ত্রিত অতিথিরা টুর্নামেন্টের ফাইনাল খেলায় ট্রাইব্রেকারে চ্যাম্পিয়ন দল নাইট কিংস এর হাতে চ্যাম্পিয়ন ট্রফি তুলে দেওয়ার পাশাপাশি রানার্সআপসহ অংশগ্রহণকারী দল ও সেরা খেলোয়াড় কিপার এদের হাতে পুরস্কার তুলে দেন।
আয়োজকরা বলেন, এই টুর্নামেন্টের উদ্দেশ্য শুধু জয়-পরাজয় নির্ধারণ নয়। গ্রামের মানুষকে একত্রিত করা, প্রজন্মের সঙ্গে প্রজন্মের সম্পর্ক আরও দৃঢ় করা এবং তরুণদের খেলাধুলার প্রতি আগ্রহী করে তোলাই ছিল আয়োজনের অন্যতম লক্ষ্য।
আয়োজন থেকে দেওয়া হয়েছে একটি স্পষ্ট সামাজিক বার্তাও—‘মাদককে না বলি, ক্রীড়াকে হ্যাঁ বলি।’ খেলাধুলার মাধ্যমে তরুণদের মাদক থেকে দূরে রাখা এবং শিশু-কিশোরদের সুস্থ বিনোদনের সুযোগ তৈরি করাই এ আয়োজনের অন্যতম উদ্দেশ্য বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।
দওলাপাড়ার এই আয়োজন যেন দেখিয়ে দিল—একটি ফুটবল শুধু গোলের হিসাব নয়; একটি বলকে ঘিরেও একটি গ্রামের মানুষ একসঙ্গে দাঁড়াতে পারে, প্রজন্মের ব্যবধান ভুলে একই আনন্দ ভাগ করে নিতে পারে। মাঠে প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকলেও মাঠের বাইরে সবাই একই গ্রামের মানুষ, একই পরিবারের সদস্য—এই বার্তাই দিনব্যাপী এই ব্যতিক্রমী আয়োজনের সবচেয়ে বড় অর্জন।
খেলা শেষ হয়েছে, পুরস্কারও বিতরণ হয়েছে। কিন্তু দওলাপাড়া ফুটবল মাঠে তৈরি হওয়া সেই মিলনমেলার স্মৃতি থেকে যাবে গ্রামের মানুষের মনে অনেকদিন।
মন্তব্য করুন