মোঃ ইব্রাহীম মিঞা, দিনাজপুর প্রতিনিধি:
খোলা মাঠে বিভিন্ন গ্রামের আদিবাসী সম্প্রদায়ের নারী-পুরুষ রঙবেরঙের শাড়ি ও নতুন পোশাক পরে ঢাক-ঢোলের তালে তালে নেচে-গেয়ে এবং নানা ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক আয়োজনের মধ্য দিয়ে দিনাজপুরের বিরামপুরে উদযাপিত হয়েছে আদিবাসী সম্প্রদায়ের ঐতিহ্যবাহী করম উৎসব-২০২৬।
শুক্রবার (২৫ সেপ্টেম্বর) সকাল ১১টায় বিরামপুর উপজেলার ৩ নম্বর খানপুর ইউনিয়নের করমতলী ফুটবল খেলার মাঠে শুরু হওয়া এ উৎসব চলে সন্ধ্যা পর্যন্ত।
বাংলাদেশ আদিবাসী পার্টি (BAP) কেন্দ্রীয় কমিটির আয়োজনে অনুষ্ঠিত উৎসবে বিভিন্ন বয়সী নারী-পুরুষ অংশ নেন। উৎসবকে ঘিরে স্থানীয় আদিবাসী জনগোষ্ঠীর মধ্যে সৃষ্টি হয় আনন্দঘন ও উৎসবমুখর পরিবেশ। করম উৎসবের ঐতিহ্যবাহী বিভিন্ন আচার-অনুষ্ঠানের পাশাপাশি আয়োজন করা হয় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও তীর প্রতিযোগিতা।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন শিতলী রানী পাহান, সংরক্ষিত মহিলা সদস্য (৪, ৫ ও ৬ নম্বর ওয়ার্ড), ৩ নম্বর খানপুর ইউনিয়ন পরিষদ এবং বাংলাদেশ আদিবাসী পার্টি (BAP) কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য। অনুষ্ঠানের উদ্বোধক ছিলেন বাংলাদেশ আদিবাসী পার্টি (BAP) কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক বাসিল স্বপন কিস্কু। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ৩ নম্বর খানপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান চিত্তরঞ্জন পাহানসহ বাংলাদেশ আদিবাসী পার্টির নেতৃবৃন্দ ও স্থানীয় আদিবাসী সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিরা।
করম উৎসব আদিবাসী সম্প্রদায়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহ্যবাহী উৎসব। কৃষি, প্রকৃতি, সামাজিক বন্ধন ও সম্প্রদায়ের মঙ্গল কামনার সঙ্গে এ উৎসবের ঐতিহ্যগত সম্পর্ক রয়েছে। উৎসবের মাধ্যমে নিজেদের সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও জীবনাচার নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরার পাশাপাশি পারস্পরিক সম্প্রীতি ও সামাজিক বন্ধন আরও সুদৃঢ় করার সুযোগ তৈরি হয়।
উৎসব উপলক্ষে আয়োজকদের পক্ষ থেকে আদিবাসী সম্প্রদায়ের বিভিন্ন দাবি তুলে ধরা হয়। দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে—আদিবাসীদের ‘আদিবাসী’ হিসেবে সাংবিধানিক স্বীকৃতি দেওয়া, শিক্ষা ও চাকরির ক্ষেত্রে বিশেষ কোটা পুনর্বহাল, জাতীয় সংসদ ও সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে প্রতিনিধিত্ব বৃদ্ধি, আদিবাসী অধ্যুষিত এলাকায় মাতৃভাষায় শিক্ষা চালু ও আদিবাসী শিক্ষক নিয়োগ, সমতলের আদিবাসীদের জন্য পৃথক ভূমি কমিশন গঠন এবং পৃথক আদিবাসী বিষয়ক মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠা। এছাড়া আন্তর্জাতিক সনদ ও কনভেনশনের পূর্ণ বাস্তবায়ন এবং আদিবাসীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করার দাবিও তুলে ধরা হয়।
উৎসবের অন্যতম আকর্ষণ ছিল তীর প্রতিযোগিতা। এতে নারী ও পুরুষ দলের প্রতিযোগীরা অংশ নেন। পুরুষ দলের প্রতিযোগিতায় প্রথম স্থান অর্জন করে জবচ গ্রাম দল, দ্বিতীয় হয় মহিষবাথান দল এবং তৃতীয় স্থান অর্জন করে দিঘলচাদ দল।
অন্যদিকে নারী দলের তীর প্রতিযোগিতায় প্রথম স্থান অর্জন করে এবচপাড়া দল, দ্বিতীয় স্থান অর্জন করে দিঘলচাদ দল এবং তৃতীয় হয় সোনাবুড়ী দল।
আয়োজকরা বলেন, করম উৎসব শুধু আনন্দ-উৎসব নয়; এটি আদিবাসী সম্প্রদায়ের নিজস্ব সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য সংরক্ষণ এবং প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে তা ছড়িয়ে দেওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। ভবিষ্যতেও এ ধরনের আয়োজনের মাধ্যমে নিজেদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ধরে রাখার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন তারা।
দিনব্যাপী বিভিন্ন আনুষ্ঠানিকতা, সাংস্কৃতিক পরিবেশনা ও তীর প্রতিযোগিতার মধ্য দিয়ে সন্ধ্যায় উৎসবের সমাপ্তি ঘটে। এতে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, বাংলাদেশ আদিবাসী পার্টির নেতাকর্মী, আদিবাসী সম্প্রদায়ের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষসহ স্থানীয়রা উপস্থিত ছিলেন।
মন্তব্য করুন