মোঃ ইব্রাহীম মিঞা,দিনাজপুর প্রতিনিধি:
দিনাজপুরের নবাবগঞ্জ উপজেলার গোলাপগঞ্জ দ্বিমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ে ২০২৬ সালের এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেওয়া ১৯ জন শিক্ষার্থীর কেউই উত্তীর্ণ হতে পারেনি। অর্থাৎ প্রতিষ্ঠানটির এবারের পাসের হার শূন্য শতাংশ। দীর্ঘদিনের একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এমন ফলাফল নিয়ে শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও এলাকাবাসীর মধ্যে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। একই সঙ্গে প্রশ্ন উঠেছে—শিক্ষার্থীদের অনিয়মিত উপস্থিতি ও অভিভাবকদের অসচেতনতার পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানের পাঠদান, তদারকি ও ব্যবস্থাপনার কোথাও ঘাটতি ছিল কি না।
১৯৬৯ সালে প্রতিষ্ঠিত গোলাপগঞ্জ দ্বিমুখী উচ্চ বিদ্যালয়টি দীর্ঘদিন ধরে এলাকার শিক্ষার্থীদের মাধ্যমিক শিক্ষা দিয়ে আসছে। বর্তমানে বিদ্যালয়ে মোট শিক্ষার্থী রয়েছে ১৫৫ জন। শিক্ষক রয়েছেন ১৩ জন। এছাড়া একজন অফিস সহকারী ও একজন অফিস সহায়ক কর্মরত আছেন। বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন মোঃ ইউসুফ আলী।
বিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, ২০২২ সালে ৩১ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে ২৪ জন পাস করে। ওই বছর পাসের হার ছিল ৭৭ শতাংশ। ২০২৩ সালে ৪০ জনের মধ্যে ১৯ জন পাস করে, পাসের হার নেমে দাঁড়ায় ৪৭ শতাংশে। ২০২৪ সালে ৩৭ জনের মধ্যে ১৯ জন পাস করে, পাসের হার ছিল ৫১ শতাংশ। ২০২৫ সালে ১৬ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে মাত্র ৫ জন উত্তীর্ণ হয়, পাসের হার ছিল ৩১ শতাংশ।
আর চলতি ২০২৬ সালে ১৯ জন পরীক্ষার্থী এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে একজনও পাস না করায় পাসের হার দাঁড়িয়েছে শূন্য শতাংশে।
অর্থাৎ গত কয়েক বছরের ফলাফল বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বিদ্যালয়টির ফলাফলে একটি ধারাবাহিক অবনতির চিত্র ফুটে উঠছে। যদিও কোনো একটি পরীক্ষার ফলাফল দিয়ে পুরো প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার মান নির্ধারণ করা যায় না, তবুও টানা কয়েক বছর ফলাফল খারাপ হওয়া এবং এবার শতভাগ শিক্ষার্থী ফেল করায় বিষয়টি এলাকায় সচেতন মানুষদের কাছে সমালোচনর কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ফলাফল বিপর্যয়ের কারণ জানতে চাইলে প্রধান শিক্ষক মোঃ ইউসুফ আলী বলেন, শিক্ষার্থীরা নিয়মিত ক্লাসে উপস্থিত ছিল না। নির্বাচনী পরীক্ষাতেও তাদের ফলাফল ভালো ছিল না। বিভিন্ন চাপ ও প্রতিষ্ঠান রক্ষার বিষয় বিবেচনা করে তাদের এসএসসি পরীক্ষায় অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়া হয়।
তিনি আরও জানান, পরীক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ আদিবাসী সম্প্রদায়ের শিক্ষার্থী ছিল এবং তাদের কেউ কেউ বিভিন্ন সময় আর্থিক উপার্জনের জন্য কাজকর্মে ব্যস্ত থাকত। পাশাপাশি গ্রামাঞ্চলে অভিভাবকদের অসচেতনতাকেও ফলাফল খারাপের অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি।
তবে এখানেই প্রশ্ন থেকে যায়—শিক্ষার্থীরা যদি দীর্ঘদিন অনিয়মিত থাকে এবং নির্বাচনী পরীক্ষায়ও সন্তোষজনক ফলাফল না করে, তাহলে তাদের শিক্ষার ঘাটতি পূরণে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ কী ধরনের বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছিল? অভিভাবকদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ, দুর্বল শিক্ষার্থীদের জন্য অতিরিক্ত ক্লাস, উপস্থিতি নিশ্চিতকরণ কিংবা ঝরে পড়া রোধে কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল কি না—এসব বিষয়ও খতিয়ে দেখা জরুরি।
একজন অভিভাবক সন্তানকে বিদ্যালয়ে পাঠান শুধু পরীক্ষায় পাস করানোর জন্য নয়; ভালো শিক্ষা, নিয়মিত পাঠদান, শৃঙ্খলা, মূল্যবোধ ও ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত করার প্রত্যাশায়। সেখানে কোনো একটি প্রতিষ্ঠানের ১৯ জন পরীক্ষার্থীর সবাই ফেল করলে স্বাভাবিকভাবেই অভিভাবকদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হওয়া স্বাভাবিক।
গোলাপগঞ্জ দ্বিমুখী উচ্চ বিদ্যালয়কে ঘিরে এখন এলাকাবাসীর প্রত্যাশা একটাই সমস্যার প্রকৃত কারণ চিহ্নিত করে শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ রক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ। কারণ একটি পরীক্ষার ফলাফল শুধু একটি সংখ্যার হিসাব নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ, অভিভাবকদের স্বপ্ন এবং একটি প্রতিষ্ঠানের প্রতি পুরো এলাকার আস্থা।
এ বিষয়ে বিদ্যালয়ের অ্যাডহক কমিটির সভাপতি মোঃ ইকবাল হোসেন (নবাবগঞ্জ উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক) এর সাথে মুঠোফোনে কথা বললে তিনি জানান, তিনি মাত্র ১০ থেকে ১২ দিন আগে নতুন কমিটিতে দায়িত্ব নিয়েছেন। ফলে আগের সময়ের কার্যক্রম ও প্রতিষ্ঠানের সার্বিক পরিস্থিতি সম্পর্কে তার সরাসরি অভিজ্ঞতা সীমিত। ফলাফল শোনার পর তিনি নিজেই পদত্যাগের সিদ্ধান্তের কথা ভাবছেন বলেও জানান।
নবাবগঞ্জ উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা দীপক কুমার বনিক বলেন, গোলাপগঞ্জ দ্বিমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ে শতভাগ পরীক্ষার্থী ফেল করার বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের পরবর্তী নির্দেশনা অনুযায়ী দেখা হবে। পাশাপাশি বিদ্যালয়ে গিয়ে শিক্ষক মণ্ডলীর সঙ্গে আলোচনা করে পরিস্থিতি পর্যালোচনা এবং যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
কুমিল্লায় মার্কশিট-প্রশংসাপত্র দিতে ‘প্রধান শিক্ষকের নির্দেশে’ ৫০০ টাকা নিচ্ছেন অফিস সহকারী
স্টাফ রিপোর্টার, কুমিল্লা:
কুমিল্লার আদর্শ সদর উপজেলার ধনুয়াইশ উচ্চ বিদ্যালয়ে বিনামূল্যে পাওয়ার কথা মার্কশিট ও প্রশংসাপত্র দিতে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে ৫০০ টাকা করে আদায়ের অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
ভুক্তভোগী একাধিক শিক্ষার্থী অভিযোগ করে বলেন, এসএসির মূল মার্কশিট এবং প্রশংসাপত্র তুলতে গেলে প্রতিষ্ঠানের অফিস সহকারী প্রত্যেকের কাছ থেকে ৫০০ টাকা করে দাবি করছেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শিক্ষার্থী বলেন, “বোর্ড থেকে এগুলো ফ্রি দেওয়ার কথা। কিন্তু অফিসে গেলেই বলে ৫০০ টাকা লাগবে।”
অভিভাবকরা বলছেন, গরিব শিক্ষার্থীদের পক্ষে বারবার ৫০০ টাকা দেওয়া সম্ভব নয়। তারা এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দ্রুত হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ধনুয়াইশ উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক দিগন্ত চন্দ্র পাল (দিগন্ত পাল) বলেন, “সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নিচ্ছে, আমরাও নিচ্ছি। আপনি কিছু করতে পারলে করেন।”
কুমিল্লা আদর্শ সদর উপজেলার শিক্ষা কর্মকর্তা শাহ জালাল বলেন, “এ ধরনের অভিযোগ পেলে তদন্ত করে দোষীদের বিরুদ্ধে বিধি মোতাবেক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অতিরিক্ত টাকা নেওয়ার সুযোগ নেই।”
শিক্ষা বিভাগের নিয়ম অনুযায়ী, শিক্ষা বোর্ড থেকে আসা মার্কশিট ও প্রশংসাপত্র শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে কোনো ফি ছাড়াই বিতরণ করার কথা। এজন্য শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে কোনো অর্থ আদায় সম্পূর্ণ বেআইনি।
ই-পেপার