
ভারতীয় সীমান্ত দিয়ে কুমিল্লায় প্রবেশ করছে চোরাইপণ্য ও মাদকের চালান। সীমান্তের কাঁটাতার পেরিয়ে বসতবাড়িতে মজুত, অটোরিকশায় পরিবহন, রেলস্টেশনে স্থানান্তর—এমন নানা ধাপ অতিক্রম করে এসব চালান পৌঁছে যাচ্ছে কুমিল্লা শহরে। পরে সড়ক ও রেলপথ ব্যবহার করে ছড়িয়ে পড়ছে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলা ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে। চোরাইপণ্যের বস্তা ও কার্টনের আড়ালে ইয়াবা, গাঁজা, ফেনসিডিল ও ট্যাপেন্টাডল পাচারের অভিযোগ উঠেছে।
নাগরিক টেলিভিশনের অনুসন্ধানে কুমিল্লার ব্রাহ্মণপাড়া, বুড়িচং, চৌদ্দগ্রাম ও সদর দক্ষিণ উপজেলার সীমান্তবর্তী বিভিন্ন এলাকায় চোরাচালান ও মাদক পরিবহনের এমন চিত্র উঠে এসেছে। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, কোথাও দিনের আলোতেই সীমান্ত পেরিয়ে নামানো হচ্ছে পণ্যভর্তি বস্তা, আবার কোথাও রাতের আঁধারে সরানো হচ্ছে মাদকের চালান। এসব পরিবহনে ব্যবহার করা হচ্ছে তরুণদের পাশাপাশি অপ্রাপ্তবয়স্ক কিশোরদেরও।
অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, সীমান্ত পেরিয়ে আসা চোরাইপণ্যের বস্তা প্রথমে নেওয়া হচ্ছে আশপাশের বসতবাড়িতে। সেখান থেকে কাঁধে বহন কিংবা অটোরিকশায় করে পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে শশীদল রেলস্টেশনে।
ট্রেন স্টেশনে পৌঁছানোর পর যাত্রীদের ভিড়ের মধ্যে বগিতে তোলা হচ্ছে বস্তা ও কার্টন। পরে কুমিল্লা শহরের কাছাকাছি ট্রেনের গতি কমলে সেগুলো নিচে ফেলে দেওয়া হচ্ছে। আগে থেকেই অপেক্ষায় থাকা লোকজন দ্রুত এসব চালান সরিয়ে নিচ্ছেন।
ঢাকা-চট্টগ্রাম রেলপথের চট্টলা, কর্ণফুলী ও নাসিরাবাদ এক্সপ্রেসসহ বিভিন্ন ট্রেন চোরাইপণ্য পরিবহনে ব্যবহৃত হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। একই ধরনের পাচার কার্যক্রমের চিত্র পাওয়া গেছে চৌদ্দগ্রাম ও সদর দক্ষিণের সীমান্তবর্তী এলাকাতেও।
সীমান্ত থেকে রেলস্টেশন, সেখান থেকে ট্রেন এবং পরে শহরের বিভিন্ন গন্তব্য—এই পুরো পরিবহন ব্যবস্থায় কারা সমন্বয় করছেন, তা নিয়ে উঠেছে প্রশ্ন।
চৌদ্দগ্রাম উপজেলার ছুপুয়া এলাকার মো. সোলেমানের বিরুদ্ধে প্রায় ১২ বছর ধরে সীমান্ত দিয়ে মাদক আনা-নেওয়ার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। এলাকায় তিনি ‘বুস্টার সোলেমান’ নামে পরিচিত।
নাগরিক টেলিভিশনের অনুসন্ধানী দলের ক্যামেরায় রাতের আঁধারে ছুপুয়া এলাকায় মাদক নামানোর দৃশ্য ধারণ করা হয়েছে। পরদিন সরেজমিনে স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে সোলেমানের পরিচয় ও কর্মকাণ্ড সম্পর্কে তথ্য পাওয়া যায়। পরে সোলেমানও ক্যামেরার সামনে বক্তব্য দেন।
তবে তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে স্বাধীন তদন্ত প্রয়োজন। সংশ্লিষ্ট আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বক্তব্য ও তদন্তের ফলাফলও এ বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
সীমান্ত দিয়ে বস্তা পারাপারে অভিনব কৌশলের চিত্রও উঠে এসেছে অনুসন্ধানে। বাঁশের খুঁটিতে পিচ্ছিল পদার্থ ব্যবহার করে বস্তা সরানোর কৌশল ক্যামেরায় ধরা পড়েছে। পরে এসব বস্তা নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিচ্ছে তরুণ ও কিশোরেরা।
স্থানীয়দের ভাষায়, এসব বাহক পরিচিত ‘ক্যারিম্যান’ নামে। প্রতিটি বস্তা নির্দিষ্ট স্থানে পৌঁছে দিতে ৫ হাজার থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত পাওয়ার কথা জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
অর্থের প্রলোভনে অপ্রাপ্তবয়স্কদের ব্যবহার করে মূল কারবারিরা নিজেদের আড়ালে রাখছে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এতে একদিকে কিশোরদের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি বাড়ছে, অন্যদিকে পাচারচক্রের মূল হোতাদের শনাক্ত করাও কঠিন হয়ে উঠছে।
সীমান্তে মাদক পাচারের ব্যাপকতা উঠে এসেছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) অভিযান ও জব্দের পরিসংখ্যানেও।
বিজিবির প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, কুমিল্লা ১০ বিজিবি ও সুলতানপুর ৬০ বিজিবির দায়িত্বপূর্ণ এলাকায় গত তিন বছরে ২০ হাজার ২০০টি অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। এসব অভিযানে প্রায় ৫২ কোটি টাকা মূল্যের মাদক জব্দ করা হয়েছে।
জব্দ করা মাদকের মধ্যে রয়েছে ৩ লাখ ১০ হাজার ৫৯৮টি ইয়াবা, ২৩ হাজার ৯৮১ কেজি গাঁজা, ৩৪ হাজার ২৩৫ বোতল ফেনসিডিল এবং ৩৪ হাজার ১৭২ বোতল স্কাফ সিরাপ।
এ ছাড়া ২০২৬ সালের জুলাইয়ে দুই ব্যাটালিয়নের জব্দ করা প্রায় ৫১ কোটি ৮৩ লাখ ৮৪ হাজার টাকা মূল্যের মাদক ধ্বংস করা হয় বলে বিজিবির তথ্য।
বিপুল পরিমাণ মাদক জব্দ ও ধারাবাহিক অভিযান সত্ত্বেও সীমান্ত দিয়ে পাচারের অভিযোগ অব্যাহত থাকায় প্রশ্ন উঠছে, পাচারকারীদের নেটওয়ার্ক কতটা বিস্তৃত এবং তাদের নিয়ন্ত্রণে কারা রয়েছেন।
সীমান্ত থেকে মাদক সংগ্রহ, স্থানীয়ভাবে মজুত, পরিবহন এবং দেশের বিভিন্ন এলাকায় সরবরাহ—প্রতিটি ধাপে একাধিক পক্ষের সম্পৃক্ততার আশঙ্কা রয়েছে। এসব কার্যক্রমের সঙ্গে অর্থদাতা, মজুতদার, পরিবহনকারী ও স্থানীয় সমন্বয়কারীদের ভূমিকা থাকতে পারে।
চৌদ্দগ্রামের ছুপুয়া, বুড়িচংয়ের ছয়গ্রাম এবং ব্রাহ্মণপাড়ার আশাবাড়ি ও শশীদল সীমান্তে চোরাচালানের অভিযোগের পাশাপাশি রেলপথ ব্যবহার করে চালান পরিবহনের বিষয়টি সামনে এসেছে।
প্রশ্ন উঠছে, সীমান্ত থেকে রেলস্টেশন পর্যন্ত একাধিক ধাপ অতিক্রম করে কীভাবে এসব চালান কুমিল্লা শহরে পৌঁছাচ্ছে? কারা চালানের অর্থ জোগান দিচ্ছে? কোথায় মজুত করা হচ্ছে এসব পণ্য? আর দেশের বিভিন্ন জেলায় সরবরাহের সঙ্গে কারা জড়িত?
মাদক পাচার প্রতিরোধে শুধু সীমান্তে চালান জব্দ কিংবা বাহক আটক করেই কার্যকর ফল পাওয়া সম্ভব নয়। পাচারচক্রের অর্থের উৎস, মজুতকেন্দ্র, পরিবহন রুট ও সরবরাহ ব্যবস্থার পূর্ণাঙ্গ অনুসন্ধান প্রয়োজন।
সীমান্ত থেকে শহর, শহর থেকে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়া এই নেটওয়ার্কের মূল নিয়ন্ত্রকদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা না গেলে বাহক পরিবর্তন হলেও পাচারের কার্যক্রম থামানো কঠিন হবে।
কুমিল্লায় মার্কশিট-প্রশংসাপত্র দিতে ‘প্রধান শিক্ষকের নির্দেশে’ ৫০০ টাকা নিচ্ছেন অফিস সহকারী
স্টাফ রিপোর্টার, কুমিল্লা:
কুমিল্লার আদর্শ সদর উপজেলার ধনুয়াইশ উচ্চ বিদ্যালয়ে বিনামূল্যে পাওয়ার কথা মার্কশিট ও প্রশংসাপত্র দিতে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে ৫০০ টাকা করে আদায়ের অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
ভুক্তভোগী একাধিক শিক্ষার্থী অভিযোগ করে বলেন, এসএসির মূল মার্কশিট এবং প্রশংসাপত্র তুলতে গেলে প্রতিষ্ঠানের অফিস সহকারী প্রত্যেকের কাছ থেকে ৫০০ টাকা করে দাবি করছেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শিক্ষার্থী বলেন, “বোর্ড থেকে এগুলো ফ্রি দেওয়ার কথা। কিন্তু অফিসে গেলেই বলে ৫০০ টাকা লাগবে।”
অভিভাবকরা বলছেন, গরিব শিক্ষার্থীদের পক্ষে বারবার ৫০০ টাকা দেওয়া সম্ভব নয়। তারা এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দ্রুত হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ধনুয়াইশ উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক দিগন্ত চন্দ্র পাল (দিগন্ত পাল) বলেন, “সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নিচ্ছে, আমরাও নিচ্ছি। আপনি কিছু করতে পারলে করেন।”
কুমিল্লা আদর্শ সদর উপজেলার শিক্ষা কর্মকর্তা শাহ জালাল বলেন, “এ ধরনের অভিযোগ পেলে তদন্ত করে দোষীদের বিরুদ্ধে বিধি মোতাবেক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অতিরিক্ত টাকা নেওয়ার সুযোগ নেই।”
শিক্ষা বিভাগের নিয়ম অনুযায়ী, শিক্ষা বোর্ড থেকে আসা মার্কশিট ও প্রশংসাপত্র শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে কোনো ফি ছাড়াই বিতরণ করার কথা। এজন্য শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে কোনো অর্থ আদায় সম্পূর্ণ বেআইনি।
ই-পেপার