ডেস্ক নিউজ
‘ওরা যা চায়, দিয়ে দাও, না হলে আমাকে মেরে ফেলবে’—লিবিয়ায় জিম্মি অবস্থায় ছোট ভাই আরিফুল ইসলামের এমন আকুতি শুনে দিশেহারা হয়ে পড়েছিলেন চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গার উজ্জ্বল হোসেন। ইতালিতে পাঠানো ও মাসে ১ লাখ ৮০ হাজার টাকা বেতনের চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে আরিফুলকে লিবিয়ায় নেওয়া হয়েছিল বলে পরিবারের অভিযোগ। কিন্তু সেখানে পৌঁছানোর পরই বদলে যায় স্বপ্নের গল্প। তাকে আটকে রেখে নির্যাতন করা হয়।
নির্যাতনের ভিডিও পাঠিয়ে পরিবারের কাছে দাবি করা হয় ২০ লাখ টাকা। ভাইকে বাঁচাতে জমি বিক্রি ও ধারদেনা করে ১০ লাখ টাকা দেন উজ্জ্বল। পরিবারের অভিযোগ, পরে তাদের বাবা ইজাল উদ্দিনকেও অপহরণ করা হয়। তাকে ছাড়িয়ে আনতে আরও ১০ লাখ টাকা দিতে হয়।
আরিফুলের পরিবারের এই অভিজ্ঞতা লিবিয়ায় বাংলাদেশি অভিবাসীদের জিম্মি করে মুক্তিপণ আদায়ের ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরে। ইউরোপে যাওয়ার স্বপ্ন দেখিয়ে বাংলাদেশিদের নিয়ে যাওয়া হচ্ছে লিবিয়ায়। সেখানে পৌঁছানোর পর অনেককে আটকে রেখে নির্যাতন করা হচ্ছে। নির্যাতনের ভিডিও স্বজনদের কাছে পাঠিয়ে অর্থ আদায় করছে পাচারকারী চক্র। লাখ লাখ টাকা দিয়েও মিলছে না মুক্তি, নিশ্চিত হচ্ছে না ইউরোপে পৌঁছানোর নিশ্চয়তা। কেউ জিম্মিদশা থেকে নিঃস্ব হয়ে দেশে ফিরছেন, কেউ ইউরোপের পথে ভূমধ্যসাগরে হারিয়ে যাচ্ছেন চিরতরে।
ইউরোপে পৌঁছানোর এই যাত্রায় বিপুল অর্থ ব্যয় করছেন বাংলাদেশিরা। ব্র্যাকের অভিবাসন কর্মসূচির সহযোগী পরিচালক শরিফুল ইসলাম হাসানের ভাষ্য অনুযায়ী, কেউ কেউ এ জন্য ২৫ থেকে ৩০ লাখ টাকা ব্যয় করছেন। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ব্যয়ের পরিমাণ ৬৫ থেকে ৬৭ লাখ টাকায়ও পৌঁছাচ্ছে। এত বিপুল অর্থ খরচ করেও গন্তব্যে পৌঁছানোর নিশ্চয়তা থাকছে না। বরং অনেকে পথে জিম্মি হয়ে পড়ছেন, নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন কিংবা সাগরে প্রাণ হারাচ্ছেন।
ইউরোপীয় সীমান্ত ও উপকূলরক্ষী সংস্থা ফ্রন্টেক্সের পরিসংখ্যানের বরাত দিয়ে ব্র্যাক জানিয়েছে, ২০০৯ সাল থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত মধ্য ভূমধ্যসাগরীয় পথ ব্যবহার করে প্রায় ১ লাখ ১০ হাজার বাংলাদেশি ইউরোপে পৌঁছেছেন। ২০২৫ সালে এ পথে পৌঁছান ২০ হাজার ২৫৯ জন। ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে লিবিয়া থেকে ইতালিতে পৌঁছেছেন ৪ হাজার ২৪৯ জন এবং গ্রিসে ৩ হাজার ৬০৮ জন। এসব সংখ্যা ইউরোপে পৌঁছানো মানুষের হিসাব; যাত্রাপথে প্রাণ হারানো, নিখোঁজ হওয়া কিংবা দেশে ফিরে আসা মানুষের মোট সংখ্যা নয়। তবে এই যাত্রার ঝুঁকি কতটা ভয়াবহ, তা স্পষ্ট হয়েছে ২০২৬ সালের দুটি ঘটনায়।
মার্চে লিবিয়া থেকে গ্রিসের পথে একটি নৌযানে ছয় দিন খাবার ও পানি ছাড়া ভেসে থাকার পর অন্তত ১৮ বাংলাদেশির মৃত্যু হয়। এরপর আগস্টে লিবিয়া থেকে ৩৮ বাংলাদেশি ও চার সুদানি নাগরিককে নিয়ে আরেকটি নৌযান যাত্রা করে। প্রায় ১১ দিন সাগরে ভেসে থাকার পর ঐ ঘটনায় অন্তত ৯ বাংলাদেশি ও এক সুদানি নাগরিকের মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়। উদ্ধার হন ২৯ বাংলাদেশি। এ দুটি ঘটনায় অন্তত ২৭ বাংলাদেশির মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গেলেও এ পথে বিভিন্ন সময়ে নিহত ও নিখোঁজ বাংলাদেশির পূর্ণাঙ্গ নির্ভরযোগ্য হিসাব পাওয়া যায়নি।
লিবিয়ায় আটকে পড়া ও বিপদে থাকা বাংলাদেশিদের দেশে ফেরানোর উদ্যোগও চলছে। ২০২৬ সালের ১৮ আগস্ট, ১ সেপ্টেম্বর ও ১৫ সেপ্টেম্বর তিন দফায় মোট ৫১৬ জন দেশে ফিরেছেন। এই সংখ্যা গত ছয় বছরে লিবিয়া থেকে ফিরে আসা প্রায় ১৫ হাজার মানুষের হিসাবের অন্তর্ভুক্ত। দেশে ফিরলেও অনেকের সামনে থাকে ঋণের বোঝা, বিক্রি করা জমি বা হারানো সঞ্চয় ফিরে পাওয়ার অনিশ্চয়তা এবং নতুন করে জীবন শুরু করার কঠিন বাস্তবতা।
লিবিয়া থেকে ফিরে আসা অভিবাসীদের নিয়ে ব্র্যাকের এক গবেষণায় তাদের অভিজ্ঞতার ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে। গবেষণায় অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের ৭৫ শতাংশ প্রতিশ্রুত চাকরি পাননি। ৯৩ শতাংশকে বিভিন্ন শিবিরে আটকে রাখা হয়েছিল, ৭৯ শতাংশ শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন এবং ৬৯ শতাংশের চলাফেরার স্বাধীনতা ছিল না। তবে এসব পরিসংখ্যান গবেষণায় অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে তৈরি; লিবিয়া থেকে ফিরে আসা সব অভিবাসীর ক্ষেত্রে একই চিত্র ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই।
কুমিল্লায় মার্কশিট-প্রশংসাপত্র দিতে ‘প্রধান শিক্ষকের নির্দেশে’ ৫০০ টাকা নিচ্ছেন অফিস সহকারী
স্টাফ রিপোর্টার, কুমিল্লা:
কুমিল্লার আদর্শ সদর উপজেলার ধনুয়াইশ উচ্চ বিদ্যালয়ে বিনামূল্যে পাওয়ার কথা মার্কশিট ও প্রশংসাপত্র দিতে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে ৫০০ টাকা করে আদায়ের অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
ভুক্তভোগী একাধিক শিক্ষার্থী অভিযোগ করে বলেন, এসএসির মূল মার্কশিট এবং প্রশংসাপত্র তুলতে গেলে প্রতিষ্ঠানের অফিস সহকারী প্রত্যেকের কাছ থেকে ৫০০ টাকা করে দাবি করছেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শিক্ষার্থী বলেন, “বোর্ড থেকে এগুলো ফ্রি দেওয়ার কথা। কিন্তু অফিসে গেলেই বলে ৫০০ টাকা লাগবে।”
অভিভাবকরা বলছেন, গরিব শিক্ষার্থীদের পক্ষে বারবার ৫০০ টাকা দেওয়া সম্ভব নয়। তারা এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দ্রুত হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ধনুয়াইশ উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক দিগন্ত চন্দ্র পাল (দিগন্ত পাল) বলেন, “সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নিচ্ছে, আমরাও নিচ্ছি। আপনি কিছু করতে পারলে করেন।”
কুমিল্লা আদর্শ সদর উপজেলার শিক্ষা কর্মকর্তা শাহ জালাল বলেন, “এ ধরনের অভিযোগ পেলে তদন্ত করে দোষীদের বিরুদ্ধে বিধি মোতাবেক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অতিরিক্ত টাকা নেওয়ার সুযোগ নেই।”
শিক্ষা বিভাগের নিয়ম অনুযায়ী, শিক্ষা বোর্ড থেকে আসা মার্কশিট ও প্রশংসাপত্র শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে কোনো ফি ছাড়াই বিতরণ করার কথা। এজন্য শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে কোনো অর্থ আদায় সম্পূর্ণ বেআইনি।
ই-পেপার