—– মতিন সৈকত
কুমিল্লার নদ-নদীর তালিকায় ঘুঙুর নদী একটি অপেক্ষাকৃত ছোট নদধারা হলেও স্থানীয় জলপ্রবাহ ও জলাভূমি ব্যবস্থার সঙ্গে এর সম্পর্ক রয়েছে। নদটির গুরুত্ব শুধু এর দৈর্ঘ্য বা প্রস্থের ওপর নির্ভরশীল নয়। বরং এর সঙ্গে সংযুক্ত খাল, বিল, নিম্নভূমি এবং পার্শ্ববর্তী কৃষিজমির পানি নিষ্কাশন ও জলধারণ ব্যবস্থার সঙ্গে এর সম্পর্ক বিবেচনা করলেই এর প্রকৃত তাৎপর্য অনুধাবন করা যায়।
নদী-তথ্য অনুযায়ী, ঘুঙুর নদী কুমিল্লা জেলার আদর্শ সদর, বুড়িচং ও ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে পরবর্তী সময়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবা অঞ্চলের দিকে অগ্রসর হয়েছে। তবে নদটির সুনির্দিষ্ট উৎস সম্পর্কে বিভিন্ন উৎসে ভিন্ন তথ্য পাওয়া যায়। কোনো কোনো নদী-তথ্যভান্ডারে কুমিল্লা আদর্শ সদর এলাকার নিম্নভূমিকে এর উৎস হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। আবার কিছু গবেষণাধর্মী লেখায় ত্রিপুরার পাহাড়ি জলধারার সঙ্গে এর উজান প্রবাহের সম্পর্কের কথা বলা হয়েছে। ফলে উৎস সম্পর্কে একটি মাত্র মতকে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে উপস্থাপনের পরিবর্তে উৎস-সংক্রান্ত মতপার্থক্যের বিষয়টি উল্লেখ করাই অধিক তথ্যনিরাপদ।
ঘুঙুর নদীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এর সঙ্গে পার্শ্ববর্তী বিল ও জলাভূমির সংযোগ। নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ বজায় থাকলে বর্ষাকালে অতিরিক্ত পানি নিষ্কাশন এবং জলাভূমিতে পানি চলাচলে এটি ভূমিকা রাখতে পারে। একইভাবে শুষ্ক মৌসুমে নদী ও সংযুক্ত জলাভূমির পানির উপস্থিতি স্থানীয় কৃষি ও জলজ পরিবেশের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। তবে এসব ভূমিকার মাত্রা স্থান ও মৌসুমভেদে পরিবর্তিত হয়।
ঘুঙুরের সঙ্গে সংযুক্ত বিল ও জলাভূমিগুলো স্থানীয় মৎস্যসম্পদের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। নদী ও জলাভূমির স্বাভাবিক সংযোগ থাকলে দেশীয় মাছসহ বিভিন্ন জলজ প্রাণীর চলাচল ও প্রজননের সুযোগ সৃষ্টি হয়। অতীতে এ ধরনের জলাভূমিনির্ভর মৎস্যসম্পদ স্থানীয় মানুষের খাদ্য ও জীবিকার একটি অংশ ছিল বলে স্থানীয় পর্যায়ে বিভিন্ন তথ্য পাওয়া যায়।
কৃষির ক্ষেত্রেও ঘুঙুর নদীর গুরুত্ব মূলত পানি নিষ্কাশন ও স্থানীয় জলব্যবস্থার সঙ্গে সম্পর্কিত। নদীর প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হলে বর্ষাকালে পার্শ্ববর্তী নিম্নভূমিতে পানি জমে থাকার সময় বাড়তে পারে। আবার নদীর তলদেশে পলি জমা, প্রবাহপথ সংকুচিত হওয়া কিংবা পানি চলাচলের স্বাভাবিক সংযোগ নষ্ট হলে জলাবদ্ধতার সমস্যা দেখা দিতে পারে। বিভিন্ন সময়ে কুমিল্লার বুড়িচং ও ব্রাহ্মণপাড়া অঞ্চলে নদী ও সংলগ্ন জলাভূমির পানি নিষ্কাশন নিয়ে যে সমস্যা দেখা দিয়েছে, তার সঙ্গে ঘুঙুর নদীর প্রবাহব্যবস্থার সম্পর্কও আলোচনায় এসেছে।
বর্তমানে ছোট নদীগুলোর মতো ঘুঙুরও নাব্যতা হ্রাস, পলি জমা, প্রবাহপথে প্রতিবন্ধকতা, অপরিকল্পিত অবকাঠামো এবং নদী-খাল-বিলের স্বাভাবিক সংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার মতো সমস্যার মুখোমুখি হতে পারে। এসব পরিবর্তনের প্রভাব বোঝার জন্য শুধু নদীর মূল প্রবাহ নয়, এর সঙ্গে সংযুক্ত খাল, বিল ও নিম্নভূমির সমন্বিত জলব্যবস্থাও বিবেচনা করা প্রয়োজন।
ঘুঙুর নদীর গুরুত্ব তাই এর আকারের তুলনায় বৃহত্তর। এটি কুমিল্লার একটি স্থানীয় জলধারা, যার সঙ্গে নদী-খাল-বিল ও কৃষিভূমির পারস্পরিক সম্পর্ক রয়েছে। এই নদীর অতীত ও বর্তমান অবস্থা সংরক্ষণ করা কেবল একটি নদীর ইতিহাস রক্ষার বিষয় নয়। বরং কুমিল্লার স্থানীয় জলপ্রবাহ, জলাভূমি ও জনজীবনের পরিবর্তনের ইতিহাস সংরক্ষণেরও অংশ।
তবে ঘুঙুর নদী সম্পর্কে আরও নির্ভুল ইতিহাস নির্মাণের জন্য পুরোনো মৌজা মানচিত্র, সিএস/এসএ/আরএস/বিএস খতিয়ান ও মানচিত্র, পানি উন্নয়ন বোর্ডের নদী-তথ্য, স্থানীয় প্রশাসনের নথি এবং প্রবীণ বাসিন্দাদের মৌখিক ইতিহাস পাশাপাশি পরীক্ষা করা প্রয়োজন। বিশেষ করে নদীর প্রাচীন গতিপথ, উৎস, শাখা-প্রশাখা, বিলের সঙ্গে সংযোগ এবং সময়ের সঙ্গে নদীর গতিপথের পরিবর্তন নির্ণয়ে এসব উৎস গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
সুতরাং, ঘুঙুর নদকে কেবল একটি ছোট নদী হিসেবে না দেখে কুমিল্লার স্থানীয় নদী-জলাভূমি ব্যবস্থার একটি অংশ হিসেবে বিবেচনা করাই অধিক যুক্তিসঙ্গত।
ঘুঙুর নদী: কুমিল্লার এক গুরুত্বপূর্ণ নদধারা
কুমিল্লার নদ-নদীর ইতিহাস ও ভূপ্রকৃতির আলোচনায় ঘুঙুর নদী একটি গুরুত্বপূর্ণ অথচ তুলনামূলকভাবে কম আলোচিত নদধারা। ছোট নদী হলেও কুমিল্লার জলপ্রবাহ, কৃষি, মৎস্যসম্পদ, জলাভূমি, জীববৈচিত্র্য এবং স্থানীয় জনজীবনের সঙ্গে এর নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। বিশেষ করে কুমিল্লা আদর্শ সদর, বুড়িচং ও ব্রাহ্মণপাড়া অঞ্চলের বিস্তীর্ণ নিম্নভূমি ও জলাভূমির পানি নিষ্কাশন এবং বর্ষাকালের জলপ্রবাহে ঘুঙুর নদীর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। বুড়িচংকে ঘিরে সাম্প্রতিক গবেষণাতেও গোমতী, পাগলী ও ঘুঙুর—এই তিন নদীকে এলাকার বন্যাঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্কিত নদী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
ঘুঙুর নদীর উৎপত্তি সম্পর্কে উৎসভেদে কিছুটা পার্থক্য রয়েছে। বাংলাদেশের নদী-তথ্যভিত্তিক River Systems of Bangladesh-এ ঘুঙুর নদীর উৎস হিসেবে কুমিল্লা আদর্শ সদর উপজেলার নিম্নভূমি (Lowland) উল্লেখ করা হয়েছে। একই উৎসে নদীটির প্রবাহ কুমিল্লা আদর্শ সদর, বুড়িচং ও ব্রাহ্মণপাড়া হয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবা উপজেলার দিকে যাওয়ার কথা বলা হয়েছে।
অন্যদিকে কুমিল্লার বুড়িচং ও কসবা অঞ্চলের পর্যটন ও নদী-ভিত্তিক গবেষণায় বলা হয়েছে, ঘুঙুরের উজানধারা ভারতের ত্রিপুরার রঘুনন্দন পাহাড় থেকে নেমে আসা একটি জলধারা/কাকড়িবিলের প্রবাহের সঙ্গে যুক্ত হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। ওই গবেষণায় নদীটিকে ঘুঙুর বা পাগলী নদী নামেও উল্লেখ করা হয়েছে।
ঘুঙুর নদীর উজান জলপ্রবাহ ত্রিপুরার পাহাড়ি অঞ্চল ও কুমিল্লার নিম্নভূমির জলধারার সঙ্গে সম্পর্কিত। বাংলাদেশ অংশে এর সুস্পষ্ট প্রবাহ কুমিল্লা আদর্শ সদর থেকে বুড়িচং ও ব্রাহ্মণপাড়া হয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবার দিকে বিস্তৃত।
কুমিল্লায় প্রবাহপথ
ঘুঙুর নদী কুমিল্লা জেলার মধ্য দিয়ে প্রধানত তিনটি প্রশাসনিক অঞ্চলের সঙ্গে যুক্ত—
কুমিল্লা আদর্শ সদর → বুড়িচং → ব্রাহ্মণপাড়া
River Systems of Bangladesh-এর তথ্য অনুযায়ী, নদীটি কুমিল্লা আদর্শ সদর ও বুড়িচং অতিক্রম করে ব্রাহ্মণপাড়ায় প্রবাহিত হয়ে পরে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবা উপজেলায় প্রবেশ করে এবং সেখানে সালদা নদীতে মিলিত হয়।
বুড়িচংয়ের পূর্বাঞ্চলের বাকশীমুল এলাকার মধ্য দিয়ে ঘুঙুরের প্রবাহের কথা গবেষণায় বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে ঘুঙুর নদীর তীরকে স্থানীয়ভাবে একটি প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের স্থান হিসেবেও বর্ণনা করা হয়েছে।
ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলার শশীদল ইউনিয়নের নাগাইশ এলাকাতেও ঘুঙুর নদীর অস্তিত্ব ও প্রবাহের প্রত্যক্ষ প্রমাণ পাওয়া যায়। ২০২৫ সালে সেখানে জেলেদের জালে একটি মর্টার শেল উঠে আসার ঘটনাকে কেন্দ্র করে স্থানীয় সংবাদমাধ্যমে নদীটির উল্লেখ করা হয়েছে।
দৈর্ঘ্য ও প্রস্থ
বাংলাদেশের নদী-তথ্যভিত্তিক River Systems-এর পরিসংখ্যান অনুযায়ী ঘুঙুর নদীর—
মোট দৈর্ঘ্য: প্রায় ৩২ কিলোমিটার
সর্বনিম্ন প্রস্থ: প্রায় ১৭ মিটার
সর্বোচ্চ প্রস্থ: প্রায় ৪০ মিটার
গড় প্রস্থ: প্রায় ৩১ মিটার
নদীটি একটি মৌসুমি নদী; জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর সময়ে সাধারণত এর প্রবাহ বৃদ্ধি পায়। নদীটির প্রকৃতি অজোয়ার/নন-টাইডাল হিসেবেও উল্লেখ করা হয়েছে।
নদীর প্রস্থ স্থান, মৌসুম, পানি প্রবাহ ও নাব্যতার ওপর নির্ভর করে পরিবর্তিত হতে পারে।
ঘুঙুর নদী ও কুমিল্লার জলাভূমি
ঘুঙুর নদীর গুরুত্ব সবচেয়ে স্পষ্টভাবে বোঝা যায় কুমিল্লার বিল ও নিম্নভূমির সঙ্গে এর সম্পর্ক বিবেচনা করলে। আনকি বিল, সিঙ্গারিয়া বিল ও পায়াতের বিল—এই তিনটি জলাভূমি ঘুঙুর নদীর সঙ্গে সংযুক্ত। নদীর প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হওয়ায় এসব বিলে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়ে হাজার হাজার একর কৃষিজমি চাষের বাইরে চলে যাওয়ার ঘটনা সংবাদে উঠে এসেছে।
বিশেষ করে পায়াতের বিলের সঙ্গে ঘুঙুর নদীর সম্পর্ক বুড়িচংয়ের কৃষি অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ। নদীর নাব্যতা কমে যাওয়া, বিভিন্ন স্থানে অপরিকল্পিত সেতু ও কালভার্ট নির্মাণ এবং নদী-শাখা ভরাটের ফলে পানি নিষ্কাশন ব্যাহত হয়েছে। এর ফলে কৃষিজমিতে দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে বলে স্থানীয় কৃষক ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন।
কৃষি ও অর্থনীতিতে ভূমিকা
কুমিল্লার গ্রামীণ অর্থনীতি ঐতিহাসিকভাবে নদী, খাল, বিল ও জলাভূমিনির্ভর। ঘুঙুর নদী বর্ষাকালে অতিরিক্ত পানি নিষ্কাশন, কৃষিজমিতে জলপ্রবাহ এবং মাছের প্রজনন ও বিচরণক্ষেত্র তৈরিতে ভূমিকা রাখে।
একসময় ঘুঙুর ও এর সঙ্গে সংযুক্ত বিল-জলাশয়গুলো স্থানীয় মানুষের মাছ ধরা, কৃষিকাজ, গবাদিপশু পালন ও দৈনন্দিন জলব্যবহারের গুরুত্বপূর্ণ উৎস ছিল। বর্তমানে নদীর পানি কমে যাওয়া ও জলাধার শুকিয়ে যাওয়ার কারণে দেশীয় মাছের আবাসস্থল সংকুচিত হচ্ছে। কুমিল্লার বিভিন্ন নদীর সঙ্গে ঘুঙুর নদীকেও দেশীয় মাছের বিচরণক্ষেত্র হিসেবে স্থানীয় সংবাদ প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বন্যা ও জলাবদ্ধতায় ঘুঙুরের ভূমিকা
ঘুঙুর নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ একদিকে যেমন বর্ষার পানি নিষ্কাশনে সহায়তা করে, অন্যদিকে নদীর বাঁধ ভেঙে গেলে বা অতিরিক্ত পানি প্রবাহিত হলে আশপাশের জনপদে দ্রুত বন্যা দেখা দিতে পারে।
২০২৪ সালের ভয়াবহ বন্যায় বুড়িচং ও ব্রাহ্মণপাড়া অঞ্চলে ঘুঙুর নদীর পানি ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। ব্রাহ্মণপাড়ায় ঘুঙুর ও সালদা নদীর বাঁধ ভেঙে পানি প্রবেশের ফলে পরিস্থিতি গুরুতর হয়ে ওঠে।
এ থেকে বোঝা যায়, ঘুঙুর নদী শুধু একটি স্থানীয় জলধারা নয়। এটি কুমিল্লার পানি নিষ্কাশন ও বন্যা ব্যবস্থাপনার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
জীববৈচিত্র্য
নদী ও বিলের সমন্বিত জলাভূমি ব্যবস্থা মাছ, জলজ উদ্ভিদ, ব্যাঙ, সাপ, হাঁসসহ বিভিন্ন জলচর প্রাণী ও পাখির আবাসস্থল তৈরি করে। ঘুঙুরের সঙ্গে সংযুক্ত বিলগুলো একসময় এ অঞ্চলের দেশীয় মাছের গুরুত্বপূর্ণ প্রজনন ও বিচরণক্ষেত্র ছিল।
কিন্তু নদীর নাব্যতা হ্রাস, পানি দূষণ, জলাধার ভরাট, অপরিকল্পিত অবকাঠামো এবং পানি নিষ্কাশনের প্রতিবন্ধকতা অব্যাহত থাকলে এই জলজ জীববৈচিত্র্য আরও সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ঘুঙুর নদীর বর্তমান সংকট
ঘুঙুর নদীর প্রধান সমস্যাগুলোর মধ্যে রয়েছে—
১. নদীর নাব্যতা হ্রাস,
২. শুষ্ক মৌসুমে পানিপ্রবাহ কমে যাওয়া,
৩. নদী ও শাখা-খালে পলি জমা,
৪. অপরিকল্পিত সেতু ও কালভার্ট নির্মাণ,
৫. নদীর তীর ও প্রবাহপথ দখল,
৬. জলাভূমির স্বাভাবিক সংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়া,
৭. বর্ষায় জলাবদ্ধতা ও আকস্মিক বন্যা,
৮. দেশীয় মাছ ও জলজ জীববৈচিত্র্যের সংকট।
বিশেষ করে অপরিকল্পিত সেতু-কালভার্টের কারণে ঘুঙুরের পানি প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়ে তিনটি বড় বিলে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হওয়ার তথ্য পাওয়া যায়।
পুনরুদ্ধারের প্রয়োজন
ঘুঙুর নদীকে রক্ষা করতে হলে শুধু নদী খনন করলেই হবে না। এর সঙ্গে যুক্ত বিল, খাল, জলাভূমি ও প্রাকৃতিক পানি নিষ্কাশনব্যবস্থাকেও একই নদী-অববাহিকার অংশ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।
নদীর সীমানা নির্ধারণ, অবৈধ দখল উচ্ছেদ, প্রয়োজনীয় স্থানে পুনঃখনন, অপরিকল্পিত কালভার্ট ও বাঁধের পানি চলাচল ব্যবস্থা পুনর্বিবেচনা এবং বিল-নদীর সংযোগ পুনঃস্থাপন জরুরি। একই সঙ্গে দেশীয় মাছ ও জলজ জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে নদীভিত্তিক ব্যবস্থাপনা গ্রহণ করা প্রয়োজন।
ঘুঙুর নদী আয়তনে ছোট হলেও কুমিল্লার প্রকৃতি ও জনজীবনে এর গুরুত্ব বড়। কুমিল্লা আদর্শ সদর থেকে বুড়িচং ও ব্রাহ্মণপাড়া হয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবা পর্যন্ত বিস্তৃত এই নদধারা স্থানীয় জলপ্রবাহকে বৃহত্তর নদী-ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করেছে। এর সঙ্গে যুক্ত বিল ও জলাভূমিগুলো কৃষি, মৎস্য ও জীববৈচিত্র্যের গুরুত্বপূর্ণ আধার।
প্রায় ৩২ কিলোমিটার দীর্ঘ এবং গড়ে প্রায় ৩১ মিটার প্রশস্ত ঘুঙুর নদীকে তাই কেবল একটি ছোট নদী হিসেবে দেখলে এর প্রকৃত গুরুত্ব অনুধাবন করা যাবে না। এটি কুমিল্লার জলাভূমি, কৃষি, মৎস্যসম্পদ, পরিবেশ ও মানুষের জীবনযাত্রার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। নদীকে বাঁচানো মানে শুধু একটি জলধারাকে বাঁচানো নয়, এর সঙ্গে যুক্ত বিল, খাল, মাছ, কৃষিজমি, জীববৈচিত্র্য এবং মানুষের জীবন-জীবিকাকেও রক্ষা করা।
(লেখক চারবার জাতীয় পদক প্রাপ্ত কৃষি পরিবেশ সমাজ উন্নয়ন সংগঠক, এগ্রিকালচারাল ইম্পর্ট্যান্ট পারসন এআইপি। গ্রন্থকার, পানি সম্পর্কিত কুরআনের আয়াত ও পরিবেশ প্রকৃতি, কুরআন হাদিসের আলোকে খাদ্য অর্থনীতি ও জলবায়ু, কুমিল্লার নদ-নদী)
মন্তব্য করুন